Thursday, June 13, 2024

স্ফুলিঙ্গ, জুন'২৪


  ।। পাঠ ভাবনা।। 



'বারকোশ' ও একান্ত অনুভব


শর্মিলী দেব কানুনগো 


আমার সদ্য পড়া বইটির নাম ‘বারকোশ’। কথাশিল্পী  রূপরাজ ভট্টাচার্যের গল্প সংকলন।

 শিরোনাম থেকেই ভালবাসায় পড়ে গেলাম বইটির। আজকের প্রজন্মের অনেকেই হয়তো বারকোশ শব্দটা শোনেনি। এই শব্দটার সঙ্গে আমারও কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে! এই নামেই একটা গল্প আছে লেখকের। তাই সংকলনের  নাম সেই গল্পকে ছুঁয়ে রাখা হয়েছে। শুধু কী তাই! এই নাম যে আমার মতো স্মৃতিমেদুর পাঠকের মনে তরঙ্গ তুলে ছড়িয়ে গেল!

বইয়ের প্রচ্ছদের কথা বলি এবার। অত্যন্ত মনোগ্রাহী প্রচ্ছদ। প্রচ্ছদ শিল্পী সুপ্তা ভট্টাচার্য। লেখককে ব্যক্তিগত ভাবে চিনি বলে প্রচ্ছদ নিয়েও দুটো কথা বলছি। প্রচ্ছদের ছবি লেখকের মা সুপ্তা ভট্টাচার্যের নিজের হাতে করা কাগজের কোলাজ। এখানেও ছুঁয়ে আছে এক ফেলে আসা দিনের হৃদয়-গাথা। কোন সূদুর অতীতে কাগজ কেটে-কেটে সেটা জুড়ে মাছ-প্রজাপতি এসব বানিয়ে ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য দেওয়ালে ঝোলানো হত। বড় অপূর্ব ছিল এই গৃহসজ্জা! সমস্তটা জুড়ে থাকত গৃহিনীর শৈল্পিক মন। আর তাতে থাকত সেই মানবীর মনের কোণে সযত্নে লালিত জাগতিক বন্ধন, যত্ন আর সাংসারিক ভালবাসার গন্ধ । 

লেখক সেই অপূর্ব স্মৃতিটুকু বড় যত্ন করে তুলে রাখলেন নিজের কাছে। মায়ের অতুলনীয় ভালবাসা যেন মাখামাখি হয়ে রয়ে গেল তার বইয়ের প্রচ্ছদে। প্রচ্ছদটা  বড্ড ভাল লাগলো সেই কারণে।

উৎসর্গপত্রে লেখা আছে আমাদের উত্তর-পূর্বের তিনজন স্বনামধন্য গল্পকারের নাম। এই উৎসর্গপত্র বারকোশকে একটা আলাদা মাত্রা দিলো। ভূমিকা লিখেছেন যিনি তাঁর গল্প পড়ে আমরা লেখার জগতে পা রেখেছি। এদিক দিয়ে বইটা বিখ্যাত কথাকার রণবীর পুরকায়স্থের আশিস-ধন্য।

মোট পনেরোটি গল্প আছে এই সংকলনে। গল্প ধরে ধরে কিছু বলব না। বইটা শেষ করে পাশে মুড়ে রেখেছি। মাথার ভেতর কিছু নাম ঘাই মারছে। অনসূয়া দেবী, শৈলবালা দেবী, সোহাগ, মণিকুন্তলা, অম্বিকাচরণ, বিশ্বেশ্বর, কল্যাণী… এদের নিয়েই গল্প লিখেছেন লেখক। এই নামগুলো কিন্তু এই সময়ের নয়। এরা সবাই আমাদের ফেলে আসা সময়কে বহন করছেন। এখানেই একটা ম্যাজিক হয়ে গিয়েছে। যে দিনগুলো আমাদের চলে গেছে,যে দিনগুলোর কথা ভাবলে আজও বুকের ভেতর হুহ করে… রূপরাজ তাঁর বলিষ্ঠ কলম দিয়ে আলগোছে সেই জায়গাটা ছুঁয়ে দিলেন। আর সেটা এই সময়ে দাঁড়িয়ে! আর তাই বারকোশ আয়েস্তা রিফু মান্দাস বড্ড ছুঁয়ে গেল। এ আমাদের চলে যাওয়া সোনালি দিনের কথকতা। বিশেষ করে বারকোশ গল্পটা একটা মাস্টারপিস হয়ে থাকবে।

বাকি গল্পগুলোর কথাও একটুখানি বলে রাখি। মনে হলো, প্রত্যেকটা গল্পে গল্পকার পুরনো বুনোট ভেঙে আবার নতুন করে সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। প্রত্যেকটা গল্পই তাই ভিন্ন-ভিন্ন স্বাদের, ভিন্ন ধরনের। 

কিছু গল্পে বর্তমান সময়ের রূঢ় বাস্তব অত্যন্ত সুচারু ভাবে ফুটে উঠেছে। ‘অন্য আমি’ গল্পটা এক কথায় অসাধারণ। এটা পড়ার পর একটা ঘোর লেগে যায়। এ নিয়ে কিছু বলা আমার পক্ষে অসম্ভব। এটা একান্তই এক অনুভবের ব্যাপার।

‘দহন মুক্তির কথকতা’ এক অন্য ধরনের প্রচেষ্টা। সম্পূর্ণ গল্প জুড়ে টেলিফোনে কথাবার্তা। এই ধরণের একটা গল্প পড়েছিলাম, বিখ্যাত লেখিকা সুচিত্রা ভট্টাচার্যের লেখা । সম্পূর্ণ গল্প জুড়ে মাত্র দুটি চরিত্র ছিল। তবে ওরা মুখোমুখি বসে কথা বলেছিল। রূপরাজ ভট্টাচার্যের এই ভাবনা গল্পের নতুন ভূমি তৈরি করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

 সবশেষে বলবো মানুষ রূপরাজ ভট্টাচার্য আর লেখক রূপরাজ ভট্টাচার্য দুটি আলাদা সত্ত্বা। আমার অন্তত বইটা পড়ে এমনটাই মনে হলো। সব মানুষের ভেতর বাড়িতে বসত করেন অন্য একজন। তাকে সব সময় দেখা যায় না, ধরা যায় না।  পরিবেশ-পরিস্থিতি-স্থান- কাল-পাত্র বিচার করে তিনি আড়ালে থেকে যান। কিন্তু অলক্ষ্য থেকে সব কিছু দেখেন, বিচার করেন। ব্যক্তিগতভাবে লেখক রূপরাজ ভট্টাচার্যকে চিনি। কিন্তু গল্পের চরিত্ররা যে মনোভূমি থেকে উঠে এসেছেন সে সব যেন সেই অধরা রূপরাজ ভট্টাচার্যের সৃষ্টি। ভেতর বাড়ির মানুষটি নিজের জমিয়ে রাখা সব দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা- অবহেলা কলমের আঁচড়ে নিখুঁত ভাবে তুলে দিয়েছেন তাঁর সৃষ্ট চরিত্রদের মুখে। তাই জীবন্ত হয়ে উঠেছে  গল্পেরা। একরাশ ভাললাগা অনুভব করলাম বইয়ের শেষ পাতাটা বন্ধ করার পর!

লেখকের কলম নিরন্তর চলুক,এই কামনা রইলো। 


    





কবিতা----------


নীল ভালবাসা


কিরণ


শঙ্খনীল হয়েছে হৃদয় 

তোমার উপচে পড়া ভালবাসা নামক অবহেলা, উপেক্ষা,ক্লিষ্টতা আর অপরিমেয় সন্দেহের মোড়কে।

অনেকদিন হলো –

চোখে রাখা হয়নি চোখ, কাঁধে মাথা

কিংবা ওই উষ্ণ হাতে হাত।

অথচ নিয়মমাফিক

রাতে ভিজি দু'জনে।

পরিপাট্য লাল সংসারের মোড়কে

শুভ্র ভালবাসারা পথের পাশে ধুঁকছে 

শুধু একটু লালন,বোঝাপড়া আর সময়ের কার্পণ্যতায়।

                           


স্মৃতি


ময়ূরী রায়

কিছু স্মৃতি দাগ রেখে যায়,
জরাজীর্ণ এ শহরের রাস্তায়। 
যখন বৃষ্টি ভেবে আঁকড়ে ধরছো তুমি,
রঙিন তোমার উর্বর মনন ভূমি।
ঠিক তখনই বালি হয়ে ফসকায়,আর
মরীচিকা হায়, 
তার গল্প থাকলো তোলা 
আজ বড়  বিষণ্ণ সাঁঝ বেলা,
আরও একবার ফিরতে হবে তাই বাড়ি ফিরে যাই।
                                                



ছবি সৌজন্য- ইন্টারনেট 

Saturday, May 25, 2024

দগ্ধ দিনের কবিতা

কবিতা যদি হয় যাপনের সঙ্গী, তাহলে রোজনামচার সব বিষয় অনায়াসে ধরা দিতে পারে কবিতায়। থিমের ভারে ভারাক্রান্ত না করে নির্বাচিত কবিদের কাছে অনুরোধ ছিল, এই দগ্ধ দিনগুলোকে আপনারা কী ভাবে অনুভব করছেন, তা নিয়ে লিখুন।

কবি যে কোনও পরিস্থিতিতেই কবিতার আতসকাচ দিয়ে চারপাশকে দেখার চেষ্টা করেন। কবি তো সত্যদ্রষ্টা! 'রোম যখন পুড়ছিল তখন নিরো বেহালা বাজাচ্ছিলেন', এই প্রাচীন উক্তি বহুশ্রুত।  তবে সেই আগুনে বা বেহালার সুরে পাপ ছিল না পুণ্য?  এই প্রশ্ন এক মাত্র কবি-ই জিজ্ঞেস করতে পারেন!

পারদ  চড়ছে। সূর্য  গনগনে  আঁচ ছড়াচ্ছে। তাই এই উষ্ণ সময়কে নিয়ে কবিদের কাব্য-অনুভবে সাজানো হলো এ বিশেষ সংখ্যা। 



তাপ নিয়ন্ত্রণে সিগারেট জ্বালাই  

দেবপ্রতিম দেব 


আজ কাকভোরে একটা স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল - 

গত প্রেমিকার কাছে ব্রাত্য হয়েছি - এই স্মৃতি , সেই পতন অভিমানে

আগলে রেখেছি নিজেকে , এই পৃথিবীতে যেমন আকাশ-পাখি , 

নদী-জল কাছে নেই গ্রীষ্মে গাছের অভাবে ;


এমন উষ্ণতার দিনে এখন 

নাগরিক জীবন আমার প্রাক্তনের মত খুঁজে ফিরে আশ্রয়ের ছায়া ;


আর আমি এই গ্রীষ্মদুপুর বারোটায় বর্তমান প্রেমিকার গালের ঘামজলে

রক্ত-আভা দেখে তাপ নিয়ন্ত্রণে সিগারেট জ্বালাই , 

ঠিক যেমন নাগরিকরা তাদের আত্মঘাতী কামাতুর স্বভাবে 

ট্রাফিকে ধোঁয়া ছড়ায় এমন উষ্ণদিনে-ও । 



অবসর

শর্মি দে


উষ্ণদিনের অবসরে 

গোপন থাকুক ব্যথারা 

অর্কিডের কান্নাবাসা

ঝুলবারান্দায় থাক ধরা!

রবিবারের সকালে 

মুক্তির উচ্ছ্বাস 

চিনামাটির ভালবাসারা

জানান দিচ্ছে ইশারায়!

মেঘলা আকাশ জানে 

মেঘের আকাশ ছোঁয়া বাকি

পদ্যের মেঘ তোমায় ঘিরে 

ফিনিক্স হয়ে আসে ফিরে-ফিরে!

পেরিয়ে যাওয়া দিনগুলো 

পরিচয়ে আসে যায়

সময়ের সংলাপ ফিরে আসে 

শূন্যতার কাঠগড়ায়!





উদ্বিগ্ন প্রহরে

কল্পিতা দেব


ফ্ল্যাট বাড়িতে ড্রয়িংরুমে সাজে মানিপ্ল্যান্ট

কিংবা ওই দেখা যায় বনসাই;

বটগাছ উপড়ে ফেলে যখন

ফ্ল্যাটটি নির্মিত হয়,

সেখান থেকেই বাঁচিয়ে 

এক গাছ-প্রেমিক তা

তৈরি করে সাজিয়েছিলেন। 

তারা খুবই যত্নে আছে

ঠান্ডা হওয়া ঘরে

কাচের শোপিসে। 

তখনই

উষ্ণতার এই বুক ভাঙা শহরে

জলন্ত বাতাসে

হাজার-হাজার গাছের

ম্রিয়মান ফুসফুস

একটু জল খোঁজে

কালস্রোতের বিদীর্ণ দর্পণে।



দহন 

 নীলাদ্রি ভট্টাচার্য


উষ্ণ ফাটল রোদের ডালে পাখির বিপুল তৃষ্ণা...বুকভরা


এখানে ক্লান্ত দহন তলায় পিষ্ট হাওয়ার শরীর

বৃষ্টিহীন শুষ্ক দিনের খালি গা। 


তবু বিপন্নতার ছোটগল্প স্বার্থপর অস্থির 

সভ্যতার কৃত্রিম সঙ্কটে থমকানো কঠিন । 

মানুষ নামের জমিতে

কাটা গাছের গন্ধ ,কাটা পাহাড়ের গন্ধ, কাটা জলের গন্ধ...


আমাদের রচিত জানালার পারে

একাকী মানবজীবনের নিঃসঙ্গ ঝরাপালক।



নীল জোছনার রাতে 

সোমা মজুমদার 


নীল জোছনার রাত, জোনাকিদের যাপন সুখের উপাখ্যান লিখছে রাত হাওয়ারা। 

জলের আয়নায় চাঁদের অহমিকা। 

দুপুরের তপ্ত রোদ ডানায় মেখে একটা পাখি মেঘের চিঠি রেখে যেতো সন্ধ্যার পাশে। 

আমি কতদিন কোনও চিঠি লিখি না। 

পৃথিবীর এদিকটা নাকি হেলে আছে সূর্যের দিকে।

তাই মেঘের কিংবা উত্তুরে হাওয়ার চিঠি নিয়ে শ্রাবণের পাখিটা এখন আর আসছে না। 

তবুও আজকের রাতটা যেন রাতপরীর ডানা থেকে খসে পড়া নীল জোছনার হিল্লোলে প্লাবিত... 

ইচ্ছে হয় এমন রাতের জোছনা মাড়িয়ে হেঁটে যাই নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে। 

সেই রূপকথার দেশে, যেখানে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর গাছের নিচে তলোয়ার পাশে রেখে নির্বাসিত রাজপুত্র একাই ঘুমিয়ে পড়ে। 


পৃথিবী এবার মেঘের দিকে হেলে আসুক,  তারপর ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামুক। 

আমি কতদিন পর আবার একটা চিঠি লিখবো শ্রাবণ পাখিটার জন্য।


অলঙ্করণ- ইন্টারনেট। 

Saturday, November 14, 2020

ভূত চতুর্দশী সংখ্যা

------------------------------------------------------

                           ।। কথামুখ।। 

------------------------------------------------



ভূত আছে।  না, ভূত নেই। 

কোনওটাই জোর গলায় কেউ সাধারণত বলতে পারে না।

 কারও কারও দাবি,' আমি ভূত দেখেছি।' কেউ কেউ যুক্তি দিয়ে দেখিয়ে দেন, ভূত মনের ভ্রম! 

যাই হোক। এই দ্বন্দ্বদোলা আছে,থাকবে। সাহিত্যেও ভূত নানা ভাবে ধরা দিয়েছে। ভৌতিক, অলৌকিক বা অদ্ভুতুড়ে মনস্তাত্বিক গল্প, এখনও চুম্বকের মত টানে। 

তাই এবার 'স্ফুলিঙ্গ' হাজির হলো সাইকোথ্রিলার আর ভূতের গল্প নিয়ে। আশা করি এই স্বাদবদল ভাল লাগবে।





সাইকোথ্রিলার 



                             গল্পে যেমন হয়


                                রুমেলা দাস


(১)

‘ প্লিজ প্লিজ প্লিজ সৌতি একবার যা না মা। বাইরে গিয়ে জাস্ট মগটা উল্টে দিয়ে আসবি। তাহলেই হবে। ও আপনা আপনি বেরিয়ে যাবে। আমি কতবার গেলাম। যাচ্ছে না কিছুতে। এদিকে আমার কাজের যে দেরি হয়ে যাচ্ছে। জামাকাপড়গুলো ভেজানো আছে। প্লিজ প্লিজ প্লিজ তোকে ভ্যানিলা আইসক্রিম খাওয়াব। আর বিরিয়ানি। এই সানডে পাক্কা। যা না। সোনা মা আমার।'

‘উফঃ কী যে জ্বালাস না। অফিসের কাজ নিয়ে একে পাগল হয়ে আছি। লকডাউন হলে হবে কী। অফিসের থেকে শালা বাড়িতে বেশি কাজ দিচ্ছে মালগুলো। ধুস... সুমনার মত আমিও বাড়ি ফিরে গেলে ভাল করতাম। কেন যে মরতে পড়ে থাকলাম। তারপর তোর এই ঢং। এত দাপিয়ে বেড়াস আর ওইটুকু একটা প্রাণীকে ভয়?’

‘ওইটুকু নয় রে, সিরিয়াসলি বেশ বড়। মানে অত বড় কুচকুচে কালো টিকটিকি আমি জীবনেও দেখিনি। কোথা থেকে মগের মধ্যে পড়ে আছে। একটুও ছটফট করছে না। পুরো স্থির। মরে গেছে কি? দেখ না মনা একটু গিয়ে।‘

‘পারিসও বটে। বড় না ছাই। তোর কাছে সবই একেকটা প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী। ইয়া বড়। ঘরের পুচকে টিকটিকিটা দেখেও তো ফড়িংয়ের মত লাফাস।‘

‘যা না মা। আমি বারান্দায় জামাকাপড় কাচতে যেতে পারছি না।‘ দীপ্তি সৌতির কাঁধ ধরে আরও একবার ঝাঁকায়। 

বিরক্তি মুখ নিয়ে ল্যাপটপে নিজের কাজটাকে সামান্য পজ করে সৌতি বারান্দার দিকে যায়।

এই হয়েছে এক বিপত্তি।

দু’দিন অন্তর অন্তর একবার সুমনা, একবার সৌতিকে ধরে প্রায় নাছোড়বান্দা অবস্থা করে দেয় দীপ্তি। ওরাও কখনও বিরক্তি মুখ নিয়ে, কখনও ভয়ানক রাগ দেখাতে দেখাতে নিরুপায় হয়ে দীপ্তির সমস্যার টেম্পোরারি সমাধান করে। কিন্তু কিছুদিন পরেই বিপদটা আবার অন্যরকমভাবে এসে সামনে দাঁড়ায়। 

সৌতি জোরে জোরে পা ফেলে খানিক গজগজ করতে করতে এগোয়। আর এদিকে দীপ্তিও  নিজেকে সেফ রাখতে সৌতি ঘর থেকে দু’চার পা বেরোতেই ওদের বেডরুমের দরজাটা ভেজিয়ে দেয়। মানেটা হল এই, বাইরে যা হওয়ার হয়ে যাক। ওই বিশেষ প্রাণীটা ঘরে না ঢুকলেই হল। অন্ততঃ দীপ্তি নিজে তো নিরাপদ থাকবে।

মিনিট পাঁচেক কেটে যায়। বাইরে থেকে খুটখাট, ধুপধাপ আওয়াজ শোনা যায়। সৌতি ঘরে আসে না। ঘর থেকে ওকে ডেকেও সারা পায় না দীপ্তি।

টিকটিকিটা মগ থেকে বেরোচ্ছে না নাকি?

ভাবতে না ভাবতেই একটা দড়াম করে আওয়াজ। সঙ্গে সঙ্গে ওদের ঘরের ভেজানো দরজাটা হাট হয়ে খুলে যায়। ‘আ আআ....’ চিৎকার করে দৌড়ে ঢুকে আসে সৌতি। ভয়ে, আতঙ্কে বান্ধবীর চেঁচামেচিতে দীপ্তি ততক্ষণে খাটের ওপর দাঁড়িয়ে। দুজনেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে। কিন্তু এরপর যে দৃশ্যটা দেখা গেল তাতে কেউ যদি চব্বিশ-পঁচিশ বছরের দুটো মেয়ের ছেলেমানুষি ধরে নিয়েও থাকেন তারা বিষয়টা একটু অন্যভাবে দেখবেন। কারণ সৌতি ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ওর পেছন দিকটা খেয়াল করলে দেখা যাবে একটা বেশ বড় মাপের কালো টিকটিকি মুখে কেমন যেন এক অদ্ভুত আওয়াজ করতে করতে তেড়ে আসছে সৌতিকে। 

ওটার হাত থেকে বাঁচতে সৌতি খাটে উঠে বসে হাঁফাতে থাকে। টিকটিকিটা একইরকম আওয়াজ করতে করতে খাটের কাছে এগিয়ে এসে কিছুক্ষণ থামে। ঠেলে ওঠা চোখ দিয়ে যেন গিলে খায় ওদের দুজনকে। তারপর কী যেন মনে হতে সরসর করে সোজা ঢুকে যায় খাটের তলায়।


(২)

‘মরেই যাব। এবার কী হবে সৌতি?’

‘কি আবার হবে?’

‘ওটা যে খাটের তলায় ঢুকে গেল।‘

‘গেল তো গেল। টিকটিকি তো খাটের তলাতেই থাকে। লুকানো জায়গায়।‘

‘না... মানে আমি তো বিছানা থেকে নামতেই পারব না। রান্নাঘরেও যেতে পারব না। যদি বেরিয়ে এসে কামড়ে দেয়? কি হবে রে?’

‘টিকটিকি কামড়ে দেবে? বাপের জন্মে শুনিনি।‘ মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসতে থাকে সৌতি।

‘খুব যে হাসছিস? আমি না-হয় টিকটিকি দেখলে হার্ট ফেল করি। কিন্তু একটু আগে যে তুই দৌড় মারলি। ঐরকম চেঁচালি? তার বেলা?’

‘যেমন তুই তেমন তোর বজ্জাত টিকটিকি। মাইরি বলছি, ওটার আকারটা নো-ডাউট বড়। একটা গা ঘিনঘিনে ব্যাপার আছে। ইশ কী কালো, গুটিগুটি। বারান্দার ঝুলঝাড়ু দিয়ে ওটাকে সরাতে গেলাম। কিছুতেই মগটা থেকে উঠছিল না। ঠেললাম। উঠলই না। তারপর মগটা যখন ফেলে দিই সোজা ঘুরে আমার দিকে তেড়ে আসে। আমি দরজা ঠেলে...’

‘সাধে কী আমি ভয় পাই বল? আমি তো মনে করি টিকটিকির থেকে ভয়ানক জীব পৃথিবীতে আর একটাও নেই।‘

‘যা ভাগ... অনেক পরিশ্রম করিয়েছিস। এবার চল... একটু চা করে নিয়ে আয় তো। অফিসের কাজটা ফিনিশ করতে হবে। নাহলে শৈলেনদা গর্দান দেবে।‘

‘না... মানে বলছিলাম... আজ...

‘দীপ্তি এবার সবশুদ্ধু তোকে ধরে খাটের তলায় ঢুকিয়ে দেব। মজা বুঝবি তখন। পালা...’

দীপ্তিকে রান্নাঘরে পাঠালেও সৌতির মনে একটা খটকা লাগে। 

টিকটিকিটা হটাৎ ওর দিকে অভাবে তেড়ে এল কেন?

যদি ওটা মানুষ দেখে ভয় পেয়েও থাকে তাহলে খাটের তলায় ঢোকার আগে কিছুক্ষণ থেমে ....

রাম... রাম... রাম... কী কান্ড! এসব কি ভাবছে ও? ম্যানিয়াক উইমেনের রুমমেট হলে এমনই হয়। শেষে কিনা টিকটিকি নিয়ে ভাবতে বসল?

নিজের মাথাতেই হাত দিয়ে টোকা মেরে ল্যাপটপে ঘাড় গোঁজে সৌতি। আর ঠিক তখনই খাটের তলা থেকে ঘরঘরে ভারী অস্বস্তিকর শব্দে ডেকে ওঠে টিকটিকিটা....

টিক... টিক... টিকটিক... টিক...


(৩)

‘আর বলিস না। আজ বিকেলবেলা যা কীর্তি করেছে আমাদের দীপ্তি। এখন নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। ...হ্যাঁ... 

আর কী... 

টিকটিকি... 

নতুন... 

ওটা আবার আমি ঘরে ঢুকিয়েছি... হি হি হি...

যাক তুই কখন নামছিস কলকাতা? 

ট্রেনে কেমন ভিড় রে? 

লেট আছে.... সন্ধে হয়ে যাবে... কী শুনতে পাচ্ছি না... হ্যালো... হ্যালো....’

শিট ফোনটা কেটে গেল! নেটওয়ার্কের সমস্যা হয়ত। 

সুমনার ফোনটা কেটে যেতে ঘড়ি দেখে সৌতি। বেশ রাত হয়েছে। ন’টা নাগাদ ডিনার করলেও কিছুতেই ঘুম আসছিল না। তাই একটু আগে ফোন করেছিল সুমনাকে।

হ্যাঁ সুমনা, সৌতি আর দীপ্তি ওরা তিনজনে পুণেতে একটা রুম শেয়ার করে থাকে। তবে ঠিক একটা রুম নয়। দুটো বড় রুম। আর কিচেন, বাথরুম, সঙ্গে বেশ বড়সড় একটা বারান্দা। ভাড়াটা ভাগাভাগি করে দেয়। তিনজনেরই কলকাতায় বাড়ি। তবে আলাপটা প্রথম হয় এখানে পুণেতে, চাকরি করতে এসেই। সুমনা স্কুলে ফিজিক্স পড়ায়, সৌতি আইটিতে, আর দীপ্তি কোন এক কনসালটেন্ট এজেন্সিতে। সৌতি আর সুমনা একবছর আগে পুণে এসেছে। একমাত্র দীপ্তির এই প্রথম ঘর ছাড়ার অভিজ্ঞতা। ঘরে এসে যখন তিনজনের পরিচয় হয় তখন দীপ্তির অযথা টিকটিকি ভীতি দেখে বাকি দুজন তেমন একটা পাত্তা দেয়নি। ভেবেছিল বাড়ি ছেড়ে থাকার একটা আড়ষ্টতা থেকেই এসব মামুলি ভয়। কিন্তু যতদিন যেতে থাকে। ততই বাড়তে থাকে নিত্য নতুন আজগুবি আতঙ্ক। বাড়ে বাকি বান্ধবীদের নিজের কাছে আটকে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা। মনে আছে একদিন তো সুমনাকে স্কুল পর্যন্ত যেতে দেয়নি ঘরের দেওয়ালে দুটো টিকটিকি মারামারি করছিল বলে।

ভাবলেই রাগ ধরছে সৌতির। করোনার জন্য সব বন্ধ। তবে সপ্তাহে একদিন করে ওদের অফিস খুলছে। তাই বাড়ি ফিরতে পারছে না ও। সুমনার স্কুল ছুটি ডিক্লেয়ার করে দিয়েছে আগামী ছ’মাস। তাই ও পালিয়েছে। এখন তো সৌতির মনে হচ্ছে বাড়িতে গেলেই সবচেয়ে ভাল হত। এই দীপ্তির সঙ্গে থাকলে ও বেশিদিন আর সুস্থ থাকবে না। এর থেকে রাস্তায় বেরিয়ে করোনা হওয়া ঢের ভাল। 

গলাটা শুকিয়ে আসছে। একটু জল খেতে হবে। বেডরুম থেকে উঠে ড্রয়িংরুমে আলোটা জ্বালাতে যাবে হটাৎ মনে হয় কে যেন সরে গেল... সোফাটার ওপর থেকে।

শিরশিরে স্রোত নেমে যায় শিরদাঁড়া বেয়ে। 

কোনও মানুষ? চোর নাকি? 

মুহূর্তে সুইচটা জ্বালিয়ে দেয় সৌতি। এপাশ ওপাশ ঘুরে দেখে। নাঃ কেউ কোত্থাও নেই। রান্নাঘরের জানলা, ঘরে ঢোকার দরজাটাও ভাল মত বন্ধ করে দিয়েছে।

তবে? 

কে ছিল? 

এতটা ভুল হল?

বেশ মনে হল কেউ যেন সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল...

আর তারপর সৌতি বুঝে ওঠার আগেই কোথায় যেন মিলিয়ে গেল...

ফ্রিজ খুলে গলাটা জলে ভিজিয়ে নিল ও। বোতলটা ঢাকনা বন্ধ করে জায়গামত রাখতে রাখতে একটা বিশ্রী গন্ধ পেল। পচা, দুর্গন্ধ... একটু আগে তো ছিল না!

তাহলে কি সেই টিকটিকিটা? মরে গেছে?

হতেই পারে। ওটা খাটের তলায় ঢোকার পর থেকে বাইরেও তো বেরোয় নি। 

এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে সৌতি শোওয়ার ঘরে পা দিতে যাবে সঙ্গে সঙ্গে সেই টিকটিকিটা আরও ভয়ঙ্কর আরও ঘড়ঘড়ে শব্দে ডেকে ওঠে...

টিক...টিক... টিকটিক... টিক


(৪)

‘দু’দিন হয়ে গেল সুমনার কোনও খবর নেই। কতবার যে ওর দাদা ফোন করেছে। তোর ফোনটার কি হয়েছে? তোকেও করেছিল। তোর ফোন নাকি পাওয়া যাচ্ছে না?’

‘তাই? আমার ফোন তো খোলাই ছিল। সত্যি সৌতি মেয়েটা যে কোথায় গেল?’

‘আমাকে পরশু রাতেই ফোন করেছিল। তোর আর তোর টিকটিকির গল্প বলছিলাম। সন্ধেতে ট্রেন কলকাতায় ঢোকার কথা। কোথা থেকে যে কি হয়ে গেল? মেয়েটা কি হাওয়ায় উড়ে যাবে?’

‘পুলিশে নিশ্চয়ই ওদের বাড়িতে খুব....’

‘তা তো করবেই। ওর দাদা বলছিল পুলিশ আমাদেরও সন্দেহের তালিকায় রেখেছে। তারওপর তোর ফোনটা পায়নি বলে নানা কথা জিজ্ঞেস করছিল। ওরা ভাবছে সুমনা ট্রেনে চেপেছিল নাকি সেটাই সন্দেহ হয়।‘

‘ছাড় তো। আমরা কি করব? আমাদের সঙ্গে আলাপ-ই বা ক’দিন?’

‘শোন দীপ্তি তোর এই ওভার কনফিডেন্স আমার ভাললাগে না। এক টিকটিকি ছাড়া তোর কোনও কিছুতেই গ্রাহ্য নেই।‘

‘কি করব বল, ওটা যে আমার ছোট থেকে...’

‘থাম একটা কথা শোন। ড্রয়িংরুমটায় কোনও স্মেল পাচ্ছিস?’

‘কই নাতো?’

‘খেয়াল করিস। একটা চাপা দুর্গন্ধ ওদিকটা থেকে মাঝে মাঝেই আমার নাকে আসছে। একদিন ঘরটা পরিষ্কার করতে হবে।‘

‘কী লাভ?’

‘মানে?’

‘মানে সুমনাও চলে গেল। আবার তুইও যাচ্ছিস।‘

‘হ্যাঁ বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে। অফিসও টোটাল বন্ধ হয়ে যাবে বলছে। এখানে থেকে কি করব? আমি আমার যা কিছু টুকটাক আছে নিয়েই চলে যাব এখানের ভাড়া গুনব কেন?’

‘ভাল করে ভেবে দেখেছিস তো? আবার যদি এখানে ফিরে আসতে হয়?’

‘ওমা সে আবার কি কথা? করোনা নির্মূল হলে, ভ্যাকসিন বেরোলে আবার তো অফিস ফিরে আসতেই হবে। তখন নতুন করে ঘর খুঁজে নেব। টেনশন কি? পুণেতে কি ঘরের অভাব? তুই যাবি না?’

‘কোথায়?’

‘কোথায় আবার? বাড়ি!’

‘আমার আবার বাড়ি?’ সৌতি দেখে দীপ্তির মুখটা গম্ভীর। এই ক’বছরে বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করলে ও এমন আচরণ করে। কেন কে জানে! 

আর কথা না বাড়িয়ে সৌতি ব্যাগ গুছাতে থাকে। দেরি করলে তো চলবে না। কাল সকালেই তো ওর কলকাতার ফ্লাইট। হ্যাঁ সৌতি ওর বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। কলকাতায়। করোনা পরিস্থিতিতে দোকান-পাঠ, মাল্টিপ্লেক্স, এমনকি অফিসটাও পুরোপুরি বন্ধ হল। একা একা বাইরে পড়ে না থেকে বেটার ঘরে ফিরে যাওয়া। অন্ততঃ বাড়ির মানুষের সঙ্গে কথা বলে তো কাটানো যাবে। তারওপর সুমনার ঘটনাটা....

মেয়েটা কি কারুর সঙ্গে পালিয়ে গেল?

তাই বা কিকরে হয়? ও বাড়ি যাওয়ার জন্য যেমন খুশি ছিল। তাতে তো সেরকম কোনও ইঙ্গিত পায়নি। একসঙ্গে এতগুলো টাইম স্পেন্ড করেছে। ওর মনে কিছু আছে বলেও জানতে পারেনি। 

উঁহু, আবার সেই গন্ধটা...

ঘাড় ঘোরাতেই দেখে দীপ্তি নিজের বালিশে শুয়ে এরমধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছে। কি মেয়ে রে বাবা? এই তো কথা বলছিল! এই ঘুমিয়ে পড়ল?

বাথরুম থেকে টপাটপ নিজের জিনিসগুলো গুছোতে গুছোতে হটাৎ ফোনটা বেজে ওঠে। একটা আননোন নাম্বার। রাত তো বেশ ভালোই হয়েছে। এত রাতে আননোন নাম্বার...! প্লেন ক্যানসেল নয়তো? 

ফোনটা কানে ধরে সৌতি। ওর সারা শরীরে কেঁপে ওঠে। কপালে জমতে থাকে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আড়ষ্ট হয়ে ওঠে হাত পায়ের সমস্তটা। কথা বলতে চায়। কিন্তু একটা শব্দও গলা দিয়ে বের করতে পারে না। চিৎকার করে ওঠে,

দীপ্তি...






(৫)

কাল সারারাত চোখে পাতায় এক করতে পারেনি সৌতি। কিভাবেই বা পারবে? ঐরকম একটা খবর পাওয়ার পর। চিৎকার করে ডেকেছিল দীপ্তিকে। তারপর খুব কেঁদেছিল। 

সুমনা আর নেই। এটা যেন মানতেই পারছে না। সৌভিক বলে সুমনার একটা ক্লোজ ফ্রেন্ড সৌতিকে ফোন করে জানায়। কোথা থেকে যে ছেলেটা সৌতির নাম্বারটা পেয়েছে। সেটা অবশ্য জানে না। জানার মধ্যে এটা জানে সুমনার লাশটা পাওয়া গেছে স্টেশনেরই কাছাকাছি একটা জায়গায়। থেঁতলানো শরীরটাকে দেখে চেনার উপায় ছিল না। নিখোঁজ ডায়েরি থাকায় ওই এলাকার পুলিশ সুমনার বাড়ির লোককে ডাকলে ওরা বাকি জিনিসপত্রে সুমনাকে আইডেন্টিফাই করে নেয়। ছেলেটা আরও রাতের দিকে সুমনার বডির ঝাপসা একটা ভিডিও পাঠায়  সৌতির ফোনে। 

উফঃ কী ভয়ঙ্কর!

আচ্ছা ছেলেটা কোনও ফেক ভিডিও তো পাঠাতে পারে?

‘ম্যাম... এয়ার হোস্টেসের গলার আওয়াজে চোখ খুলে তাকায় সৌতি। মেয়েটা ট্রে করে চা, কফি, স্ন্যাকস নিয়ে এসেছে। যতক্ষণ না বাড়ি যায় গলা দিয়ে কিচ্ছু নামবে না ওর। ও মাথা দুলিয়ে না করে দেয়। 

কাঁচের জানলার ওপার দিকে মেঘ, রোদের লুকোচুরি খেলা দেখতে থাকে। এখন বাজে সকাল ৬টা৩৫মত। এতক্ষণে তো দিনের ঝকঝকে আলো ফুটে যাওয়ার কথা। কিন্তু একদলা মেঘ সূর্যের সোনালী আলোকে আটকে রেখেছে। যেন তারা কিছুতেই চায় না আলো ছড়িয়ে যাক পৃথিবীর বুকে। যেন তারা চায় না দিগন্ত জুড়ে একঝাঁক রঙিন স্বপ্নের শুরু হোক। ঠায় মেঘের দিকে তাকাতে তাকাতে আচমকা সৌতি আবিষ্কার করে ওর জানলার পাশে পাশে যে মেঘটা উড়ে উড়ে ভেসে আসছে। সেটা যেন... সেটা যেন... একটা বিশেষ বিশেষ আকৃতির....

সৌতির গা গুলিয়ে ওঠে। পেট মুচড়ে বমি বেরিয়ে আসতে চায় মুখ দিয়ে। শারীরিক টালমাটালের মধ্যেই তার মনে পড়ে যায় সবটা...

চোখ বুজিয়ে নেয় ও। একহাতে মুখ চেপে অন্যহাতের আঙুলে চাপ দিয়ে প্লেনের মাথার ওপরের সতর্কীকরণ সুইচটা টিপে ধরে সজোরে।

চোখ জুড়ে নেমে আসে একটা কালো পর্দা...। 


(৬)

‘আপনি ঠিক আছেন তো?’

‘হুম’ চোখটা সামান্য খুলেই আবার বন্ধ করে নেয় সৌতি। ওর মুখের ওপর ঝুঁকে রয়েছেন একজন ভদ্রমহিলা। উনি বাঙালি। পাশেই বসেছিলেন। সেটা ও আগেই লক্ষ করেছে। হয়ত এই প্যান্ডামিকে কলকাতা ফিরে যাচ্ছেন।

হোস্টেসগুলো নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করছিল। ওকে অসুস্থ দেখে মুখে চোখে জল ছিটিয়েছে। জামাটা ভেজা। আর মিনিট পনেরোর মধ্যে প্লেন ল্যান্ড করবে বলে অ্যানাউন্স হচ্ছে। সিট বেল্টটা বেঁধে দিয়ে ওকে একটা ওষুধ দেয় হোস্টেস মেয়েটা। সৌতি সেটা মুখে পুরে সামান্য ঘাড় ঘোরায় জানলার দিকে।

আকাশটা এখনও মেঘলা। 

আবারও চোখ বুজিয়ে নেয়। সুমনার থেঁতো শরীরটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। কে অভাবে শেষ করে দিল ওকে? কিন্তু অদ্ভুতভাবে ওই ঘেঁটে যাওয়া শরীরটার মধ্যেও ওর চোখদুটো যেন সৌতির বুকটা ফালাফালা করে দিচ্ছিল। 

কী নিদারুণ ভয় আর যন্ত্রণা মিলেমিশে। কিছু কি বলতে চাইছিল ও? কি? 

প্লেনটা গতি বাড়িয়েছে। সামান্য দুলে উঠে নামতে শুরু করেছে মাটি ছোঁয়ার আকুলতায়। আরও আরও জোরে .... দুলে উঠেছে সব কিছু... কারা যেন নিজেদের মধ্যে কথা বলে চলেছে... খুব জোরে কি? হ্যাঁ... ওরা তো চিৎকার করছে.... পাশে বসে থাকা ভদ্রমহিলাও চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন... কিসের যেন একটা পোড়া গন্ধ নাকে আসছে..। শরীরের সব শক্তি একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে.... কি হচ্ছে ... কেন হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না ও.... বোঝার মত অবস্থাও নেই... ফায়ার... ফায়ার বলছে কেন? গরম একটা ভাপ আর অনেক অনেক ধোঁয়া ভরে গেছে ভেতরটায়... আর সব ছাপিয়ে সৌতির নাকে আসছে একটা বিশ্রী পচা গন্ধ...

যদিও গন্ধটা ওর খুব চেনা...

                             

(৭)

‘এই ধরণের সিম্পটম ওর কবে থেকে হয়?’

‘মানে ডঃ ব্যানার্জি এটা অনেক ছোট থেকেই। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমরা ওকে ফেলে রাখিনি। রেগুলার ট্রিটমেন্ট করেই গেছি। তাও যে কেন এমন?’

‘হ্যালুসিনেশন।‘

‘হ্যাঁ ডাক্তারবাবু... আমাদের মেয়েটা...’ 

‘আপনি মা হয়ে যদি এভাবে ভেঙে পড়েন। তাহলে তো খুব মুশকিল। সবচেয়ে আগে আমার একটা অভিযোগ আছে।‘

‘অভিযোগ?’

‘আপনারা বাবা-মা সবটা জেনে মেয়েকে বাইরে চাকরি করতে পাঠিয়েছেন কেন?’

‘আমি দিব্যি করে বলছি, মাঝে মাঝে ও খামখেয়ালি হয়ে পড়ত ঠিকই। কিন্তু ট্রিটমেন্টের পর পর স্কুল জীবন থেকেই ও একটু একটু করে স্বাভাবিক হচ্ছিল। মানে কখনও হুট করে এমন কিছু কথা বা ব্যবহার করত না যেটা আমাদের মনে সন্দেহ গড়ে তোলে। আপনাকে কি করে বোঝাব ডাক্তারবাবু আমি বা ওর মা কেউই চাইনি ও পুণে যাক। মেয়েটাই জেদ করল। আজকালকার মেয়ে একটা কিছু ভুল সিদ্ধান্ত যদি নিয়ে বসে। তাই শেষমেষ আমরাও সায় দিই...’

‘না আপনারা যাই কারণ দেখান। যদি পাঠাতেই হত আপনারা কেউ একজন মেয়ের সঙ্গে গিয়ে থাকতে পারতেন। সলিউশন তো অনেক কিছুই আছে। তাই না?’

‘তা আছে। আমরা সেটা ভেবেও ছিলাম। কিন্তু মেয়েই পুণেতে কিছুদিন থাকার পর বলল, ও নাকি রুমমেট পেয়ে গেছে। তায় বাঙালি। আমরা একটু নিশ্চিন্ত বোধ করি। মেয়েটার সঙ্গে আমরা ফোনে যোগাযোগও রাখি।'

‘আচ্ছা মিসেস বোস আরেকটা জরুরি কথা। উনি যে বারবার টিকটিকির কথা বলে চলেছেন। সজ্ঞানে, অজ্ঞানে। ওটা ঠিক কিসের কারণে বলতে পারবেন কি? এটা কি আগেও হয়েছে? না সদ্য এই ধরণের হ্যালুসিনেশন দেখছে।‘

‘আসলে... ডাক্তারবাবু.... এটার একটা পাস্ট ...'

‘বলুন মিসেস বোস। থেমে যাবেন না। আপনারা যদি চান আপনাদের মেয়েকে ভাল করতে হবে। তাহলে আমার গোড়া থেকে জানা বড্ড প্রয়োজন।‘

‘আসলে আমাদের দুই মেয়ে। যমজ। সোমা আর সৌতি। অন্যজন আজ থাকলে একই বয়সী হত। সোমা দুর্ভাগ্যবশত প্রতিবন্ধী জন্মায়। হলে হবে কি? দুই বোনে খুব ভাব ছিল। পাঁচ বছরেও সোমা দাঁড়াতে পারত না। আসলে ভয়টা ওর মধ্যেই ছিল। টিকটিকির। আমরাও একটু একটু করে মানিয়ে নিচ্ছিলাম। এরকম একটা সময়েই বিপদটা ঘটে। ওদের দুই বোনকে আয়ার কাছে রেখে আমরা একদিন একটা জরুরি কাজে বেরিয়েছিলাম। মাঝরাস্তায় ফোন আসে সোমা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। দৌড়তে দৌড়তে বাড়ি ফিরি। দেখি সোমা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। চোখ খোলা। মুখ দিয়ে সামান্য সাদা ফেনা। আর ওর থেকে দু’মিনিটের ছোট বোন কি একটাকে যেন পা দিয়ে পিষে ফেলছে। আয়া আমাদের যা বলেছিল তাতে জানতে পারি, সোমা শুয়েই ছিল। কোথা থেকে হটাৎ একটা টিকটিকি সোমার বুকের ওপর পড়ে। সোমার টিকটিকিতে মারাত্মক ভীতি ছিল। টিকটিকিটাও হয়ত কয়েক সেকেন্ড ভয়ে ওর গায়েই পড়েছিল। কিন্তু অঘটন যা ঘটার তখনই ঘটে যায়। কারণ আয়া  সেই সময়ই বাইরে আইসক্রিম কিনতে যায়। ফিরে দেখে সৌতি ওর দিদির গা থেকে টিকটিকিকে হাত দিয়ে তুলে পিষতে শুরু করেছে। ভয় বলুন, হ্যালুসিনেশন বলুন তারপর থেকে শুরু হয়...’

‘তাহলে মিঃ আর মিসেস বোস আপনারা জানতেন এই প্রাণীটার সম্পর্কে নানান কথা গল্প সৌতি প্রায়ই বলে থাকে বা থাকত।'

‘ঠিক কথা। কয়েকমাস আগেই বলেছিল ওর একটা নতুন রুমমেট এসেছে। সৌতি আমাদের বলে দীপ্তির নাকি টিকটিকিতে ভয়। পরে ওর বাবা আমি দুজনেই দীপ্তির ফোন নাম্বার চেয়ে ওর সঙ্গে কথা বলি। কিন্তু দীপ্তির তেমন কোনও অদ্ভুত ভয়, ভীতি ছিলই না। আর আজ যখন এয়ারপোর্ট থেকে ওর অসুস্থতার কথা জানিয়ে ফোন... আমাদের আর কোনও আশা...'

‘আর ওই যে আরেকটা কথা বারবার বলছিল সৌতি সুমনা বলে কার যেন মৃত্যু...’

‘ওর ফ্ল্যাটে সুমনা বলে কেউ ছিল না। আমরা রেগুলার কথা বলতাম। ভিডিও কল করতাম। এ খুব লজ্জার কথা ডাক্তারবাবু এই গন্ধ, অহেতুক আশেপাশে কাউকে বা কারুর উপস্থিতি মনে করা। কারুকে ভীতু দেখিয়ে নিজেকে সাহসী প্রতিপন্ন করা এসবই সৌতির হ্যালুসিনেশন। আমাদের মেয়েটা আর ভাল হল না ডাক্তারবাবু। একটু একটু করে শেষ হয়ে যাচ্ছে.... মাত্র চব্বিশ বছর বয়স। ওর বিয়ে দেব...’

‘আমি আবারও বলছি আপনারা ভেঙে পড়বেন না। আমি চেষ্টা করব। এখন ৭দিন মত সৌতিকে এই নার্সিংহোমেই রাখতে বলব... কয়েকটা ওষুধ আনিয়ে দেবেন প্লিজ।‘

(৮)

‘জানিস সবাই আমাকে পাগল বলছে। আমাকে মিথ্যে মিথ্যে এই হাসপাতালের বেডে আটকে রেখেছে। সেই... সেই তোকে যেমন বাবা-মা আদর করত আমার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। ঐরকম আদর এখন আমাকে করতে চায়। আমি কি বোকা ছিলাম তাই না সোমা? তখন ভাবতাম বুঝি তোকে  আমার চেয়ে বেশি আদর করে আদপেই ওগুলো তো দয়া... দয়া... প্রতিবন্ধীকে কে আর ভালবাসবে বল? আমাকেও সবাই এখন দয়া করবে। চাই না... আমি দয়া চাই না.... সোমা... আমি বাঁচতে চাই তাইতো পুণে চলে গেছিলাম কাজ করতে। কিছুতেই মন বসাতে পারলাম না। তুই... তোর সেই বজ্জাত টিকটিকটি আমাকে... উফঃ... আমি নাকি পাগল? আচ্ছা তুই বল আমি কি অন্যায় করেছি? তুই কষ্ট পাচ্ছিলিস উঠতে পারতিস না হাঁটতে পারতিস না... এদিকে এদিকে... মাছের বড় পিসটা... মাংসের নরম তুলতুলে অংশটা তোর ভাগেই... আর আমি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতাম...। খুব সুযোগ এসেছিল বল। বাবা-মা বেরিয়ে গেল। আয়া মাসিকে আইসক্রিম কিনতে পাঠিয়ে তোর তুলতুলে বুকে ছেড়ে দিলাম যেটা দেখে তুই সবচেয়ে বেশি ভয় পাস...

টিকটিকি...

আর তারপর...

তোর যখন ঘাড় হেলে পড়ল... ওটাকে তুলে বেদম মারতে থাকলাম। আর আয়া মাসি বোকা হয়ে গেল। আর আমিও... দেখিস... আমি... আআ...মি এখান থেকেও ঠিক বেরিয়ে যাব... 

ঠিক গল্পের মতন...

কেউ আমাকে ধরতেই পারবে না।

উফঃ সেই পচা গন্ধটা... আমি জানি তুই তুই আসিস... সোমা তোর গা থেকেই আসে গন্ধটা....

হা হা হা... আমি কেমন পা নাড়াচ্ছি। হাতও। আমি তোর মত নই...’

রুম নাম্বার ১৭থেকে ভেসে আসছিল কিছু অস্পষ্ট কথা।

খুব খেয়াল করলে নার্সিংহোমের কোনও ঘুপচি দেওয়ালের কোণ থেকে ছোট্ট একটা শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছিল হাওয়ায় হাওয়ায়...

টিক... টিক...টিক... টিকটিক...

                            -------------------


---------------------------------------------------------------



ভূতের গল্প






                            কামড় 

                    

                       ডাঃ কনকদীপ শর্মা 


"আমি শুধু শুধু কেন যে আসলাম! না আসলেই তো পারতাম..."- চায়ের দোকানে বসে অত্যন্ত বিরক্ত সুরে বলল আলোক। 

আলোকের কাঁধ চাপড়ে বীরু বলল- "আহা... কী যে বলিস! এখানের মতো মজা তোর বেঙ্গালুরুতে পাবি? বছরে তো একবারই ছুটি পাস।"

প্রসেনজিৎও মৃদু স্বরে বলল-"রাইট!"

আলোক আরো বিরক্ত হল-"দ্যাখো ভাই, আমি জানি না। বৃষ্টি যতই হোক, আমি এবার বের হবই। তোমরা সঙ্গে আসলে আসো, নইলে আমি একাই চললাম। আর আসবো না নেক্সট ইয়ার থেকে বলে দিলাম..."

অগত্যা সন্ধ্যার পর সবাই ঝমঝম বৃষ্টির মধ্যে ছাতা নিয়ে বের হল।


গতকাল থেকে বৃষ্টি যে শুরু হল, এখনও ধরে নি। কখনও কমছে, কখনও মুশলধারে ঝরছে। আলোক বেঙ্গালুরুতে এক বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করে। বছরে শুধু সাতদিনের দীপাবলির ছুটি। তখন বাড়িতে আসে৷

বাল্যবন্ধু প্রসেনজিৎ ও বীরু এখানেই গ্রামের বাড়িতে থাকে। ব্যবসা করে দু'জনেই। আর সারা বছর ধরে আলোকের অপেক্ষা করে, সে আসলেই সবাই মিলে কয়েকদিন  খুব আনন্দ করে। তবে এই বছর ব্যতিক্রম। নভেম্বরের এই সময় সমাজের বৃদ্ধরাও কখনও বৃষ্টি দেখেননি। দীপাবলির দু'দিন আগে, মানে গতকাল বৃষ্টিমুখর দিনে ফ্লাইট থেকে নেমেই আলোক পড়লো মহা দুশ্চিন্তায়। "বৃষ্টি কমবে তো?"- এই ভয় পেয়ে বসলো। 

বৃষ্টির জন্য গতকাল বিকালটা বসে বসে আড্ডা মেরে কাটালো তিনজন।

আজ সকাল থেকেই আলোক বলছিল-"আজকে কিন্তু আমরা ঘুরবো, যতই বৃষ্টি হোক, ফ্লাড হয়ে যাক।"

দুপুর যখন তিনটে, আলোক ছাতা নিয়ে বের হলো। পায়ে একটা রাবারের স্যান্ডেল। গন্তব্য বীরুর বাড়ি। যাবার সময় বেকারি থেকে কেক নিয়ে নিল। বেকারির বাইরে ছাতাটা রেখে ভেতরে ঢুকে একজনকে পেয়ে আলোক প্রচণ্ড উৎফুল্ল হয়ে উঠলো- "আরে আরে, রিম্পি দি, কী খবর?"

রিম্পিদিও অবাক। টকটকে লাল লিপস্টিক লাগানো ঠোঁট হাঁ হয়ে গেলো-"আলো....ক! তুই? বাহ, কবে আসলি?"

"এইতো কালকেই আসলাম"- জবাব দিল আলোক। 

রিম্পিদি একটা চিকেন প্যাটিস খেতে খেতে বলল-"ফাইন, চল্ আমার সাথে।"

আলোক কেক অর্ডার করে বলল-"প্লিজ আজকে না, আরেকদিন আসবো। আজকে একটু যেতে হবে।"

রিম্পিদি হেসে বলল-"আচ্ছা ঠিক আছে, আসতে তো হবেই তোকে। কেক নিচ্ছিস যে, নজর লাগছে কিন্তু, সাবধানে খাস!"

কথাটা শুনে জোরে হেসে ফেলল আলোক। 


বৃষ্টির দুপুরে বীরু ঘুমোচ্ছে। আলোকের ধাক্কা খেয়ে ধড়মড়িয়ে উঠালো সে। চোখ কচলে কচলে বলল-"হুমমমম... দাঁড়া প্রসেনজিৎকে ডাকি।"

বীরু ফোন লাগালো প্রসেনজিৎকে। 


মাঝারি কেকটা সবাই মিলে সাবাড় করলো। তবে একটা পিস কাগজে প্যাক করে আলোক রেখে দিল তার পকেটে। ঘরে নিয়ে যাবে। 

বীরু ও প্রসেনজিৎএর মোটেই ইচ্ছে ছিল না এমন দিনে বাইরে ঘুরতে যাওয়ার। কিন্তু অবশেষে আলোকের 'হুমকি' খেয়ে ওদের যেতে হল। 

বাইরে বের হয়ে আলোকের মনে হল যেন তার ছাতাটা হালকা হালকা লাগছে। ওর ছাতার হ্যান্ডেলে CLASSIC লেখা থাকার কথা। কিন্তু তাকিয়ে দেখলো যে হ্যান্ডেলে কিছুই লেখা নেই। অন্য কারোর ছাতার সঙ্গে বদলে গেলো না তো? বেকারির বাইরে রেখেছিল ছাতাটা। বাইরে আরেকটা ছাতা ছিল। ভেতরে ছিল রিম্পিদি। এর মানে বাইরের অন্য ছাতাটা রিম্পিদির ছিল। হয়তো তার ছাতার সঙ্গে ভুল করে অদলবদল হয়ে গেছে। এমন হলে পরে ম্যানেজ করা যাবে, চিন্তার কিছু নেই। 

এখন মনে হচ্ছে গভীর রাত। অথচ মাত্র সাড়ে ছয়টা। জায়গাটা ওদের ছেলেবেলার খেলার মাঠ ছিল। এখন ঘরবাড়ি হয়ে গেছে। চেনাই যায় না। আলোক বলল-"না ভাই কিছুই আগের মতো নেই। ভালো লাগছে না।"

বীরু বলল- "সত্যি। আগের মতো নেই রে।  হ্যাঁ  কয়েকটা জিনিস ওই সেম আছে। ওই তেঁতুলগাছটা মনে আছে?"

আলোক একটু চিন্তা করে বলল-"কোন্ তেঁতুল গাছ রে? ওই যেটার নীচে আমরা যেতে ভয় পেতাম? "

"হ্যাঁ হ্যাঁ সেটাই"- বীরু বলল-" যাবি?"

"ডেফিনিটলি যাবো!"- জানালো আলোক। 

ভেতরের ছোট কাঁচা রাস্তাটা ধরলো ওরা। বৃষ্টির বেগ যেন ক্রমেই বেড়ে চলেছে।


ছোটবেলায় সেটাকে যেমন বীভৎস আর বড়ো মনে হত, এখন সেটাকে খুব সাধারণ মনে হচ্ছে। শৈশব তো এমনই৷ সাদামাটা জিনিসও অসাধারণ মনে হয়, সামান্য উঠানও মনে হয় যেন বিরাট মাঠ।

কালো ঘন তেঁতুল গাছের গোড়া দিয়ে সেই সরু নালাটা বৃষ্টির জন্য বিরাট আকার ধারণ করেছে। গম্ভীর স্রোতের শব্দে বয়ে চলেছে জলরাশি। টর্চের আলো ফেলে দেখা গেল যে একটা কলাগাছ কোত্থেকে জলে ভেসে আসছে।

নালার জল কাঁচা রাস্তায়ও উঠেছে। রাস্তায় কোন্ জায়গাটা উঁচু আর কোন্ জায়গাটা নিচু, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।

প্রসেনজিৎ ভীতু নয়। তবে বীরু আর আলোকের মতো দুঃসাহসীও নয়। সে বলল-" হবে এবার ফিরে যাই, না কি?"

আলোক বলল-"একটু ওইদিকটা ঘুরে এসে যাই, চল। তারপর ব্যাক টু হোম।"

অগত্যা সবাই খরস্রোতা নালার পাশের রাস্তা দিয়ে তেঁতুল গাছের নিচ দিয়ে সাবধানে হেঁটে চলল। ভূত চতুর্দশী,  তারপর বৃষ্টি। এমন অন্ধকার মনে হয় পৃথিবীতে খুব কমই নেমেছে। 

হঠাৎ আলোক একটা কথা বলে উঠলো -"এই এদিকে আসবি না। রাস্তার ওই সাইড দিয়ে চল্।"

বাকি দুইজন রাস্তার অন্য পাশে সরে যাচ্ছিল। আলোক নিজেও সরে আসছিল, আর তখনই তার বাম পা পিছলে ঢুকে গেল রাস্তার মধ্যবর্তী একটা গর্তে। তলিয়ে যেতে লাগলো সে। ডান পা উপরে রাস্তার যে জায়গায় ছিল, সেই জায়গাটাও ভেঙে যাচ্ছে। দৌড়ে আলোকের পাশে এসে তার এক হাত ধরলো দুই বন্ধু। আর আলোকের আরেক হাতে ছিল ছাতা, সেই হাতগর্তের ভেতরে ঢোকানো। খুব জোরে বীরু আর প্রসেনজিৎ হাত ধরে টানতে লাগলো। কিন্তু টেনে তোলা যাচ্ছে না কোনোভাবেই। আলোক প্রাণপণে চেষ্টা করছে, হঠাৎ চাপা গলায় সে বলল- " ছাড়ো আমাকে, ছাড়ো।"

বীরু চীৎকার করলো-"বলিস কী? ছাড়বো কেন? 

ট্রাই কর, ট্রাই কর। জোর দে আলোক। "

আলোক এবার জোরে বলল-"তোদেরকে বলছি না রে। তোরা আরো জোরে টান আমায়। আমার পায়ে কিছু একটা কামড়ে ধরে নীচে টানছে, খুব শক্তি তার। ভাই আমাকে বাঁচা, বাঁ....চা....."

অবশেষে প্রচণ্ড শক্তি লাগিয়ে যখন আলোককে উঠানো হল, তার অবস্থা খুবই দুর্বল। খুব শীঘ্রই সে জ্ঞান হারালো।


প্রায় দুই ঘন্টা পরে স্থানীয় হাসপাতালে জ্ঞান ফিরলো আলোকের।

"আমি ঠিক আছি?" অস্ফুটে বলল আলোক। একটা স্যালাইন চলছে।

প্রসেনজিৎ পাশেই বসে ছিল। সে বলল-"এভরিথিং ইজ ফাইন।"

ইতিমধ্যে একজন সিস্টার একটা ইঞ্জেকশন আনতেই আলোক ধড়মড়িয়ে বিছানায় উঠে বসে জিজ্ঞেস করল-"কিসের ইঞ্জেকশন?"

সিস্টার বললেন যে পায়ে রক্ত বের হওয়ায় এটা নিতে হবে। টিটেনাস ইঞ্জেকশন। 

দেখা গেল যে আলোকের পায়ে একটা কামড়ের দাগ। নিরীক্ষণ করে দেখা গেল যে সেটা কোনো বন্য প্রাণী বা পোকার কামড় নয়, সেটা মানুষের কামড়ের দাগ। গোলাকার, সবগুলো দাঁতের ক্ষতস্থান স্পষ্ট  দেখা যাচ্ছে। যে যে জায়গায় দাঁতের আঘাত লেগেছে, সেখানে শুকনো রক্ত লেগে রয়েছে। যথারীতি আলোক এসব দেখে বিস্মিত হল, তারপরই অজানা দুশ্চিন্তা তাকে পেয়ে বসলো। গর্ত থেকে পা বের করতে গিয়ে সমস্ত শক্তি ক্ষয় করে কাহিল আলোক আর ত্রাস সহ্য করতে পারছে না। চিন্তিত আলোককে কোনোরকমে যখন শান্ত করা যাচ্ছে না, তখন হাসপাতালের ডাক্তার এলেন। 

ডাক্তার এসে বললেন-"দেখুন মিঃ আলোক, এমন কেস আগে দেখিই। হিউম্যান বাইট অঢেল দেখেছি, কিন্তু এভাবে মাটির নীচে মানুষের কামড়! অবাস্তব লাগে না? আপনার হিস্ট্রি শুনে মনে হচ্ছে কোনো পোকার কামড়, বা এই ধরুন ইঁদুর বা কাঠবিড়ালি  বা সেরকম কোনো রোডেন্টেএর কামড়। অথচ এই মার্ক দেখলে স্পষ্ট বলা যায় যে কোনো মানুষ কামড়েছে। বুঝতে পারছি না। তবে আমার খুবই ইন্টারেস্টিং লাগছে এই ব্যাপারটা। আপনি যদি চান, তাহলে একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে পারি।"


আলোক তৎক্ষনাৎ বলল-"নিশ্চয়ই। স্যার আমিও খুবই টেনশনে আছি। কী ছিল মাটির নীচে, শিগগিরই জানতে চাই।"


ডাক্তার গভীরভাবে কিছুক্ষণ পরীক্ষা করলেন। ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে দেখলেন। এরপর ক্ষতস্থান থেকে তুলা দিয়ে কিছু স্যাম্পলও নিলেন।

সিস্টার এর মধ্যে টিটেনাস ইঞ্জেকশন দিয়ে দিয়েছেন আলোককে। তারপর আলোকের পায়ের ক্ষত জায়গাটা ড্রেসিং করা হল। 

প্রায় ঘন্টাখানেক পর ফের আসলেন ডাক্তার। হাতে একটা রিপোর্ট। উনি এসে ঠোঁট উলটে বললেন- "বেশ কনফিউসিং কিন্তু মিঃ আলোক !"

আলোক ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল।

ক্ষানিকটা বিরতি নিয়ে চিন্তিত আলোক ও তার বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার আবার বললেন- " পায়ের ইঞ্জ্যুরি থেকে একটা অয়েল পাওয়া গেছে, যেটা শুধু বেকারির কনফেকশনারিতে ব্যবহার করা হয়..."

ডাক্তারের কথা শুনতে শুনতে আলোক হঠাৎ হাত বাড়িয়ে উনাকে থামতে বলল, তারপর নিজের পকেট হাতড়ে বলল-"আমার পকেটের কেকটা কোথায়? বীরু, প্রসেনজিৎ,  তোরা কেকটা বের করেছিস? "

বীরু বিরক্ত হল-"ধ্যাৎ,  ছাড় না কেকের কথা। স্যারের কথা শোন।"

আলোক আবার উত্তেজিত হয়ে গেল-"আর আমার ছাতা? সেটাও নিয়ে গেল! নাকি গর্তে রয়ে গেল? কোথায়?..." 

বীরু ধমক দিল-"চুপ্...আর ফালতু কথা না। " 

আলোক আর কিছু না বলে অন্যমনস্ক হয়ে বসে পড়লো। তার নিশ্বাস জোরে জোরে পড়ছে। 

ডাক্তার আবার বললেন-"তো আমি বলছিলাম যে, একটা অয়েল পাওয়া গেছে যেটা স্পেশালি বেকারিতে ব্যবহার করা হয়। আরেকটা এভিডেন্স পেয়েছি- সামান্য প্রোটিন জাতীয় খাবার, মাংস বা ডিম হবে, সম্ভবত সেই প্রাণীটা বেকারির কোনো এগ্ বা চিকেন আইটেম খেয়েছিল। অবিশ্বাস্য বাট ফ্যাক্ট। এবার সত্যি বলছি, প্রাণীটা কোনো প্রাণী নয়, বরং মানুষ ছিল, সম্ভবত মহিলা। কারণ সেই কামড়ের দুদিকে লাল দাগ পাওয়া গেছে, সেটা যে লিপস্টিকের কেমিক্যাল তা আমি নিশ্চিত।"

সব শুনে অস্ফুটে বলল আলোক-"রিম্পি দি...!"

বীরু বলল-"কী বলছিস আলোক?"

আলোক ঢোক গিলে বলল-"জানিস, আজ আমি রিম্পিদিকে বেকারিতে দেখেছিলাম- চিকেন প্যাটিস খাচ্ছিল। আর তার ঠোঁটে লাল লিপস্টিক ছিল। আরেকটা কথা, রিম্পিদির সঙ্গে আমার ছাতা ভুলে ভুলে এক্সচেঞ্জও হয়ে গেছে। "

বীরু চেচিয়ে বলল-"ইম্পসিবল!"

আলোক বুঝাতে লাগলো-"ভাই বিশ্বাস কর, আমি সত্যিই দেখেছি.. রিম্পিদি আমাকে তার বাড়িতেও ডেকেছিল। বলেছিল- আসতে তো হবেই তোকে... কিন্তু আমিই বললাম যে আজ নয়, আরেকদিন..."

বীরু এবার আরো চেচিয়ে বলল-" তোকে কী করে বুঝাবো, রিম্পদি আর নেই। মরে গেছে। স্যুইসাইড করেছে গত রবিবারে... তোকে আর বলা হয় নি, ভেবেছি আসলে জানাবো..." ।"

বীরুর হাত চেপে ধরলো আলোক। মুখে কথা নেই। 

বীরু বলে চলল- " তুই হয়তো বেকারিতে ভুল করে অন্য কাওকে দেখেছিস রে। কারণ রিম্পিদিকে তুই আর কখনো দেখতে পারবি না। আগুনে পুরো শরীর জ্বলে গিয়েছিল ওর। কী আগুন লাগলো হল সেটা এখনও স্পষ্ট জানি না। ওদের পরিবার থেকে বলছে দুর্ঘটনা৷ কিন্তু এখনো খটকা রয়েছে। কারণ সেটা যে আত্মহত্যাও হতে পারে, সেটা অনেকেই বলছে। কারণ রিম্পিদির ইটিং ডিসোর্ডারটা কেউ মেনে নিতে পারতো না পরিবারে। একটা মেয়ে এক মাস ধরে সারাদিন খেতেই থাকবে, আবার এক মাস বিন্দুমাত্র না খেয়ে কাটাতে চাইবে এসব মেনে নিতে তো সবাই পারেন না। সাইকিয়াট্রিস্ট নাকি দেখানো হয়েছিলও, কিন্তু মেডিসিন খেয়ে সাময়িক ভাবে সুস্থ হয়েও আবাএ ইটিং ডিসোর্ডারের কবলে পড়লো রিম্পিদি। পরিবারের লোকের গালিগালাজ আর কত সহ্য করা যায়? যখন তখন বের হয়ে এই সেই খাওয়াদাওয়া করতো বাইরে। টাকা না থাকলে পরিচিত-অপরিচিত সবার কাছেই টাকা চাইতো। এসবের জন্য পরিবারে আরো বেশি ভর্ৎসনার পাত্রী হল সে। তারপর একদিন হঠাৎ এই অগ্নিকাণ্ড ও রিম্পিদির মৃত্যু.... তোকে ভেবেছিলাম আগেই বলবো, তারপর ভাবলাম যে থাক, তুই আসলেই... " কথা  শেষ করতে পারলো না বীরু...

দ্বিতীয় দফা আলোক অজ্ঞান হয়ে পড়লে ডাক্তার তাঁর পাল্স ও হার্টবিট পেলেন না। শ্বাসপ্রশ্বাসও বন্ধ যেন। পায়ের ক্ষত থেকে এখনও রক্ত ঝরছে। এম্বুল্যান্স করে মেডিকেলে পাঠানো হল আলোককে। 

ভূত চতুর্দশীর গহন অন্ধকার ভেদ করে ঠাণ্ডা বৃষ্টির ফোঁটা ধরার বুকে পড়তে থাকে ক্রমাগত।



অণুগল্প


                                    মা 


                         দেবাশিস সায়ন


বল হরি হরি বল ...


 মায়ের চিতায় আগুন দিয়ে বুবুন অঝোরে কাঁদল।

বাবাগো মা সত্যি মরে গেল ?

হঠাৎ বুবুন দেখতে পেলো চিতার পাশে তার মা বসে আছেন আর মিটিমিটি হাসছেন...

দৌঁড়ে মার কাছে যেতে চাইলো কিন্তু বাবা বললেন, আগুন দিয়ে চিতা আর দেখতে নেই রে। 

কে যেন হঠাৎ বলে উঠল, 

বুবুন রে চটি পর ঠাণ্ডা লাগবে!



                                ***

   



অলংকরণ -- সুজয় দাম

                 ও  অন্তর্জাল



Tuesday, November 10, 2020

স্ফুলিংগ ২য় বর্ষ, ১৯ তম সংখ্যা

 

                 

                              ।।   কথামুুখ ।। 


করোনাকাল আমাদের  জীবনের চেনা ছককে বেমালুম পাল্টে দিয়েছে। শুরু হয়েছে 'নিউ নর্মাল' যাপন। 

অদৃশ্য ভাইরাস যখন সবকিছুকে থামিয়ে দিয়েছিল, তখন কিন্তু সাহিত্যিকরা থেমে থাকেননি। চার দেওয়ালের মধ্যে থেকেও ব্যস্ত ছিলেন সময়টাকে অনুভব করতে। যার ছায়া পড়ছে তাঁদের রচনায়।

তবে এক জায়গায় থেমে থাকা যায় না। সাহিত্যও থামে না। অতিমারির মধ্যেই পুজো এলো। চলেও গেলো। 

স্ফুলিঙ্গ আবার হাজির। এবারে বিশেষ সংখ্যা নিয়ে। থাকছে গল্প, কবিতা, গদ্য কবিতা ।  আশা করি ভাল  লাগবে আপনাদের।


ক  বি  তা



রাখী সরদার


জাগরণ


হাতের পাঁচ আঙুলে

টোকা মেরে দেখো 

            অন্ধকার কটিবাঁকে

             আকাশ জেগেছে কিনা।


দেখো,আকাশ জাগাটা

ভীষণ জরুরি।


ওই ছদ্ম খরায়

ধান্য-দুধ ফেটে লাল,

           নদী ও লোহিত রাগে

            কাদায় রেখেছে মাথা

থেমেছে ঢেউয়ের কোলাহল ।


তুমি কি ঘুমিয়ে  গেলে?

খড়কুটো আনন্দে!


জাগো,দামাল বাতাস,

 মেঘ ভাঙে ব্যাকুল ফোঁটায়,            

                   ভেসেছে তোমার নেত্রকোণ ,

                   আর্দ্র রূপে  সমস্ত আকাশ।




 
             
নীলাদ্রি ভট্টাচার্য


স্নান


অপ্রাপ্ত সাঁতারের কৌতূহলে কিছুদিন আগে নেমেছিল সর্পশূন্য দিঘি

বিকেলের মাথায় সেই দিঘিতে স্নান করে বাড়ি ফিরে শীতের মাটিতে শুয়ে পড়ে জলে বাঁধা কথার সিঁদুর 

ঠুনকো নীল ধ্বনি তখন এসে বসে আবেগের কাজল গার্হস্থ্য আশ্রমে

কিছুই যে নেই তার ভেতর 

শীতের মত দুঃস্থ উজ্জ্বল বাঁশি
শুধু অস্তমিত  আঘাতের স্বপ্নগুণের নিরাপদ দাগে
প্রদক্ষিণ করে নামের স্পর্শ মুখর আয়ুর আঁচিল।





রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ 


কৌশল 

বারান্দায় প্রলাপ 
আর শীতের জন্ম শিরায়

গভীর বিষন্নতা

বন্ধ্যা  ক্ষেতে ছড়িয়ে
মুঠো মুঠো ব্যর্থতা






বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য


অনিন্দ্য শরৎ

নীলাম্বরী শুভ্র কাশের 
কেশর দোলায় 
প্রত্যাশিত আলোয় খোঁজে নেই 
সুখের হোমাগ্নি 

মাঠে প্রান্তরে আলিঙ্গন করে আশ্বিনী রোদ।

সারাক্ষণ...
সবুজ চোখে কুয়াশার অঞ্জনে 
বেজে ওঠে
নবচেতনার শঙ্খধ্বনি 
এক শিরোনামহীন 
ভালোবাসায়।



শৈলেন দাস 


জল-আত্মা


জলদাসের মৎস্যঘ্রাণ আমার শৈশব-সুবাস
জলের কলকল ধ্বনি শব্দের মিঠাস।

ছেঁড়া পাল ডিঙ্গি নৌকা পদ্মপুরাণ
কৈশোর কেটেছে যেন জলে ভাসমান!

তারপর ছন্দপতন, বাঁচার তাগিদ
বাসস্থান, জীবনশৈলী, আত্মতত্ত্ব বদল বিবিধ...


এখন শহুরে সভ্যতায় মিশে আছি বহুকাল
ইট কংক্রিটের পরিবেশে অভ্যস্ত জীবন, তবুও
জলের সাথে যোগ রয়েছে আমার আত্মার।




দেবাশিস সায়ন 


আশ্বিন


মা বলাটা কি সহজ তাই না?
দশ মাস দশ দিনের জঠর যন্ত্রণার কথা ভুলে গেলি?
দুর্গা পূজা বৃদ্ধাশ্রমে করবি?
মেয়ে শব্দটার অর্থ শুধু সহবাস?
অঞ্জলি মাতৃজঠরে হোক মৃত্তিকায় নয়!



                  গ  দ্য  ক  বি  তা



রূপরাজ ভট্টাচার্য 


বাজি


আজ একটি আকস্মিক পরীক্ষা হলো বন্ধু ! আজ সকল কথাই উপচার হয়ে সেজে উঠেছিল ধীর লয়ে ; তবু পুজো সারা হলো না কিছুতেই ! নির্মাল্য তাই বহতা স্রোতেই ভাসিয়ে দিলুম ! 

যে কথাগুলো অমলিন আর অভ্রান্ত সত্য ভেবে তুলে রেখেছিলাম দেরাজের গোপন খাঁজে , সে যে ফাঁকি ছিলো কে জানতো । আজ বিস্রস্ত বিবেকের সামনে পরীক্ষা হলো বন্ধু ; হ্যাঁ, বড়োই অকস্মাৎ ।

তুমি একেবারেই তৈরি ছিলে না ; নয়তো পুরোনো কথার মৌতাতে জ্বালিয়ে রাখতে সোপান, যেভাবে অভ্যস্ত হাতে নিয়ত সাজাতে পিলসুজ ! ... ''অনেক যাতনার পরও অবিন্যস্ত অবিচল থাকবে সময়'' -- এই গালভরা  কথাটাকেই প্রতিষ্ঠা দিতে সদা তৎপর থাকতে হয়তো । কিন্তু বড় ভুল হলো বন্ধু, বড় ভুল করে ফেললে ! 

আজকের পরীক্ষায় তোমাকে জিতিয়ে দিতে চেয়েছিলাম বারবার ; তবু জেতা বাজি বুঝি হেরে বসে আছি দু'জনেই ! আজ এই আকস্মিক পরীক্ষায় 'হেরো হেরো' বলে চিৎকার করে উঠছে মেধা ও মনন ---- তবু বুঝতে পারছি না হার-টা আসলে কার হলো!






 
তীর্থংকর চক্রবর্তীর  চারটে কবিতা



ভালোবাসা : মন্দ্র-মধ্য-তারে


নীড় ভাঙা শোকের গোরস্থানে
হরফে হরফে
কেন রাত্রি উড়িয়ে দাও !

অক্ষর ভালোবাসা পেলে
শব্দ হয়ে ওঠে ।
দরবেশ-মেঘ
গির্জা হয়ে ওঠে প্রেমিকের ।
ভালোবাসা পাহাড় পেরোলে
তর্জমা করে দিও,
নামাজী সন্ধ্যার শা'জাহান হয়ে রবে ।
                  



পথ হারানোর প্রতিশ্রুতি


যে পাখি উড়ে গেছে বিশ্বস্ত খাঁচায়
সে কি কাফের হলো কবি !

খুঁজে দেখো,
ভীরু জলময়ূরী মেঘে,
ওরসা রাতের বন্ধ্যা খোয়াবনামায়,
কিচ্ছা-রোদের নামতা লেখা থামে,
খানিক অন্য নামে
বটের বৃদ্ধ হাতে-
পাখি রেখে গেছে তার ডানার অস্তভাগ,
না-ফেরার কোন‌ও জোরালো প্রতিশ্রুতি ।

পাখি তো জেনেছে,
বন্দির কোন‌ও ঠিকানা হয় না দেশে ।
তুমি কি জেনেছ ?
পৃথিবীর পথে বাউল চলেছে সুদূরকে ভালোবেসে

!
                              



শাহজাদী


বলার আগে বুঝতে যদি পারো
ঠোঁটের বাঁধে গোপন কথার ঢেউ-
ওই ডাগর চোখে আঁকতে যদি পারো
এই হৃদয়-খোঁড়া ভালোবাসার নদী-
বন্ধু হতে আপত্তি নেই আর ।
আপত্তি নেই
চেনা-জানা সর্বনাশে ওড়না হতে ।
আপত্তি নেই
অবিশ্বাসী লোডশেডিং এ ভরসা হতে ।
আপত্তি নেই
ইচ্ছে-স্রোতের আড়-ইশারায় নিষেধ মানার ।
আলাদিনের প্রদীপ যদি ঘষতে পারো-
দুপুর রোদে শহর ঢেকে সাজতে পারি,
সমাজ-ভীরু শাহজাদীর একলা পথের কেউ ।
                             



স্বপ্নে দেখা স্বপ্নপুরী


একলা বাঁচার রসদ কী ভাই

বলতে পারো ?

অনেক লোকের ভিড়ে যে'জন

হয়নি আপন অন্য কারো !

শেকড় শুধু ছড়িয়ে গেছে

আঁকড়ে ধরার অবুঝ আশায়,

দূরের গায়ে কাছ ঘেঁষেনি

এক পৃথিবীর ভালোবাসায় ।

নিছক কোন‌ও গোত্র ছাড়া

আমরা হবো বন্ধু যেদিন,

অভিধানের শব্দ-মানুষ

মানুষ হয়ে উঠবে সেদিন ।

সুতোর বাঁধন, কাঁটা-ছেঁড়া

অন্ধ চোখের জারিজুরি,

ভাগের নীতি যাক ভাগাড়ে

সমাজই হোক স্বপ্নপুরী ।


---------------------------------------------------------

গ  ল্প



বিভ্রম  


শর্মিলী দেব কানুনগো 


দীপের জীবনের আজ এক অনাস্বাদিত আনন্দের দিন। আজ মিতা আসছে দীপের কাছে। দীপ  মানে দীপঙ্কর। সুদর্শন, সুচাকুরে। মিতা ওর গত মাসে বিয়ে করা বৌ। আজ শ্বশুরবাড়ি থেকে স্বামীর কর্মস্থলে নতুন সংসার পাততে আসছে।  ওর জন্যই বাস স্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছে দীপ। 


দূর থেকে দীপকে দেখে হাত নাড়ল মিতা। মনে অনাগত ভবিষ্যতের আনন্দ শিহরণ। দীপের হাত ধরে মিতা এসে দাঁড়াল ওদের নতুন ঠিকানায়। খুব সুন্দর বাড়ি। সামনে দুদিক খোলা বারান্দা।  এক ফালি সবুজ বাগান। এক ঝলকে পছন্দ হল। আবার একরাশ খুশি ভালোলাগা হয়ে ছড়িয়ে পড়লো মিতার শিরায় শিরায়। শরীরে প্রবাহিত হল সেটা, মনেও। আনন্দের অবগাহনে দিন কাটতে লাগলো। 


  কদিন পর অফিস ফেরত দীপ দেখল গেটের সামনে একজন দাঁড়িয়ে। অবিন্যস্ত আর অপ্রকৃতিস্থ। দু চোখে হাহাকার আর বেদনা। পলকহীন ভাবে তাকিয়ে আছে দীপের বাড়ির দিকে। দীপকে দেখেই  লোকটা সন্ত্রস্ত  হয়ে পালিয়ে গেল । পরের দিন আবার লোকটাকে একই ভাবে দেখল দীপ। আগ্রাসী দুচোখ কাকে যেন খুঁজছে। তারপর আর কি! পুরুষ দীপের মনে জাগল সেই চিরাচরিত চিন্তা। মিতা কে খুঁজছে কি? তবে কি মিতার পুরনো..? কায়দা করে রাতে খাবার টেবিলে জিজ্ঞেস করল মিতাকে।  গ্রামের সরল মনের মেয়ে মিতা বলল একজন ভালবাসা জানিয়েছিল, কিন্তু মিতার অনাগ্রহে ব্যাপারটা এগোতে পারে নি। 


রোজ লোকটা আসে। রোজ দীপ ওর চোখে হাহাকার দেখে। স্বাভাবিক ভাবেই প্রভাবিত হয় দাম্পত্য জীবন। দীপের মনে হল মিতা মিথ্যে বলছে। মিতা নিশ্চয়ই  নিজের ভালোবাসার সাথে প্রতারণা করেছে । তাই তো সে  আজও মিতাকে দেখতে আসে।  ধীরে ধীরে সন্দেহের কালো ছায়া দীপকে সম্পূর্ণ গ্রাস করল। সবুজ বাগানের লাল গোলাপগুলো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। 


       মিতা চলে গেছে ওর বাবার বাড়ি একরাশ অভিমান নিয়ে। দীপের অনাদর আর অবজ্ঞা ওকে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে। মিতা কিছুতেই বুঝতে পারল না কেন দীপ হঠাৎ এতো বদলে গেল। কেন যে এত অকারণ  সন্দেহ করত। এই আঘাত সহ্য করা মিতার জন্য সহজ ছিল না। আর দীপ! অসহ্য  এক উত্তাপে পুড়ে যেতে থাকল সে। 


আজ আবার লোকটাকে দেখে মাথা ঠিক রাখতে পারল না দীপ। পালাবার আগেই ওকে ধরে ফেলল। বারবার জিগ্যেস করা সত্ত্বেও কিছু বলল না লোকটা। বাধ্য হয়ে হাত তুলল দীপ। মিতার উপর জমানো সমস্ত রাগ অভিযোগ উগরে দিল পাগল টার উপর। এতো মার খেয়ে শুধু বলল      " মা"। তারপর কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। 


 অনেক দিন হয়ে গেল আর আসে নি লোকটা। দীপ কিছুটা শান্তি পেয়েছে। কিন্তু মিতার এই প্রতারণা ওকে মনে মনে দগ্ধ করছে। ও যে নিজের চোখে দেখেছে লোকটার চোখ পরম আগ্রহে মিতাকে খুঁজছে। সে চোখে শুধু ভালবাসা ছিল। ছিল প্রিয়জনকে  একটি বার  দেখার  আকুলতা । 


 পরের দিন সকালে গেটের সামনে ভিড় দেখে এগুলো দীপ। পাগলটা মরে গেছে। পাশের বাড়ির একজন বললেন মরল তো সেই নিজের বাড়ির সামনে। জিজ্ঞেস করে দীপ জানল পাগলটা ওর ভাড়াবাড়ির মালিকের ছোট ভাই। দাদা পাগল ছোট ভাইকে বের করে দেয় বাড়ি থেকে। অসুস্থ মাকে একটু চোখের দেখা দেখতে ও আসত। জানত না দাদা বাড়িভাড়া দিয়ে এখান থেকে চলে গেছে। 


 এবার দীপের প্রায়শ্চিত্তের পালা। মিতাকে ফিরিয়ে আনল। কিন্তু এ মিতা অন্য কেউ। দীপের দেয়া আঘাতে আজ মিতা ভাষাহীন স্থবির। দীপকে চিনতেই পারল না। সারাদিন বারান্দায় বসে মিতা দীপের অপেক্ষা করে। সেই দীপকে খুঁজে যে বাসস্ট্যান্ডে মিতার অপেক্ষা করেছিল।




            



অলংকরণ - সুজয় দাম।

 





Sunday, September 27, 2020

স্ফুলিঙ্গ, ২য় বর্ষ, ১৮তম সংখ্যা

 

---------------------------------------------------

                কথামুখ

----------------------------------------------------

কোনও কোনও কবিতা পাঠকের মনের আর্কাইভে পাকাপাকি ভাবে জায়গা করে নেয়। জীবনের নানা  বাঁকে ফিরে আসে কবিতাটি। এমনই একটা রচনা নিয়ে এবার লিখলেন বিশিষ্ট কবি সুজিৎ দাস। 

এবারের সংখ্যায় মুক্ত গদ্য লিখলেন পৌলমী চক্রবর্তী।  

আপনাদের ভাল লাগবে আশা করি।


========================================




                      একটি কবিতার কাছে


                                  সুজিৎ দাস


বিশ্বরাজ, তুমি বলেছিলে, একান্ত ভাললাগা কোনও একটি কবিতা নিয়ে কিছু লেখার জন্য। আসলে কী জানো, কোনও কবিতা, কোনও ছোটগল্প এসব নিয়ে কিছু একটা লিখতে বসলেই চোখে ভেসে উঠে সাহিত্যজগতের প্রাতিষ্ঠানিক লেখক বা প্রাবন্ধিকদের রাশভারি ছবি। তাদের অধিকাংশের লেখার বৃহৎ পরিসর জুড়ে থাকে দেশ-বিদেশের নানান সাহিত্যতত্ত্ব আর বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে সুদীর্ঘ সব প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতিগুচ্ছ। লেখকের মৌলিক চিন্তাভাবনার চেয়ে প্রায়শই এইসব তত্ত্বকথা আর  উদ্ধৃতির অনাবশ্যক বাহুল্য আমাদের মতো সাধারণ পাঠকদের কাছে ভারবহ হয়ে উঠে। তত্ত্বকথা ও উদ্ধৃতির জটাজালে লেখকের নিজস্ব ভাবনাবিশ্বকে আমরা ছুঁতে পারি না, তাঁর মৌলিক ভাবনাটা যেন কোথায় হারিয়ে যায়।

তুমি যখন বললে, আমার পঠিত যে কোনও সময়ের কোনও একটি কবিতা নিয়ে আমার একান্ত অনুভূতি ও বোধের জায়গাটি ব্যক্ত করার জন্য, আমি ভীষণ সমস্যায় পড়ে গেলাম। কী লিখবো, কী ভাবে লিখবো? কোন ভাললাগা কবিতা নিয়ে লিখবো বা কার কবিতা নিয়ে লিখবো? সকল কবিতাপাঠকের মতো আমিও সময় পেলে কবিতাই বেশি পড়ি। আবহমান বৃহত্তর বাংলা কবিতার ভুবনে এরকম অসংখ্য কবির কবিতা ছড়িয়ে রয়েছে যে গুলোর মধ্যে বেশ কিছু কবিতা অনেকের মতো আমাকেও স্পর্শ করেছে আলোড়িত করেছে আকুল করেছে। কখনও বা পাঠক হিসেবে কোনও কবিতা সহসা চমকেও দিয়েছে।

এ মুহূর্তে আমি যে কবিতাটিকে আশ্রয় করেছি সেটি বাংলা কবিতার পংক্তিভুক্ত নয়। বাংলায় অনূদিত আধুনিক অসমিয়া সাহিত্যের একটি অনালোচিত উপেক্ষিত অসাধারণ একটি কবিতা----


                               পোস্টমর্টেম


( অন্ধ্রপ্রদেশের আদিলাবাদে কাঠের চোরাকারবারি ও পুলিশের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে নিহত হওয়া একজন আদিবাসী যুবক)


প্রথমে তাকে তিন টুকরো করা হলো


কণ্ঠ থেকে বের করে আনা হলো সঙ্গীত

দু'চোখ থেকে নদী


বুকটা আবার দু'ভাগ করা হ'লো


কলজে থেকে তুলে আনা হ'লো প্রেম

পাকস্থলী থেকে শস্য


এবার তার পা দু'টোও আলাদা করে রাখা হলো


হাত থেকে খুলে রাখা হ'লো শব্দ

বাহু থেকে সাহস


অবশেষে জামাটাও দু'ভাজ করা হলো


বোতাম থেকে মুছে দেওয়া হ'লো চুম্বন

পকেট থেকে বিশ্বাস


ভোরবেলা সংবাদপত্রে বেরোলো


সে আদিলাবাদের একজন নির্ভীক যুবক


      ( অসমিয়া থেকে অনুবাদ: সুভাষ কর্মকার)


আধুনিক অসমিয়া সাহিত্যের বিশিষ্ট কবি সমীর তাঁতীর  এই কবিতাটি যখন আমি প্রথম পড়ি সেই ১৯৮৬ ইংরেজিতে, সত্যিকার অর্থে আমাকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। আমার মনে হয় এ ধরনের কবিতাও লেখা যায়! পাঠকের মেধা মননে চাবুকের মতো যেন আঘাত করে কবিতাটির এক একটি শব্দবন্ধ, এক একটি বাক্যবন্ধ। সবচেয়ে বড় কথা,এতটা বছর পেরিয়ে যাবার পরও আজকের ভারতবর্ষে সামজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষিতেও কবিতাটি ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। কেউ হয়ত বলবেন 'রাজনৈতিক কবিতা' কেউ  বলবেন 'প্রতি কবিতা'। যে সংজ্ঞাতেই কবিতাটিকে বন্ধনিভুক্ত করুন না কেন কবি তাঁর সামগ্রিক বোধ দিয়ে তাঁর নিজস্ব বয়ানটিকে স্বতন্ত্রভাবে ব্যক্ত করতে পেরেছেন কি না সর্বোপরি কবিতা হয়ে উঠেছে কি না আর সেই কবিতা পাঠকের মেধা-মননে কোনও অমোঘ অভিঘাত সৃষ্টি করতে পেরেছে কিনা সেটাই হচ্ছে আসল কথা। আমার মনে হয় সমীর তাঁতীর 'পোস্টমর্টেম' কবিতাটি এদিক থেকে বিচার করলে নিঃসন্দেহে একটি অনন্য সাধারণ কবিতা। বিষয় ও শৈলীর দিক থেকেও কবিতাটি অনন্য।


বিশ্বরাজ, পংক্তি ধরে ধরে কবিতাটিকে নিয়ে কাঁটাছেড়া আমার মনে হয় অপরিমিতিবোধের পরিচায়ক একইসঙ্গে  পাঠকদের প্রতিও অসম্মান প্রদর্শন। তাই এ থেকে বিরত থাকলাম। কবিতাটি একটি ছোট ঘটনাকে নিয়ে লেখা। অন্ধ্রপ্রদেশের একটি সাহসী আদিবাসী যুবকের মরণপণ লড়াইয়ের কথা কবিতাটিতে বলা হয়েছে। যুবকটি সেই রাজ্যের আদিলাবাদ নামক একটি অঞ্চলে কাঠের চোরাকারবারি ও রাষ্ট্রের তথাকথিত রক্ষক পুলিশের দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গিয়ে অসহায়ভাবে মৃত্যু বরণ  করে। এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর অনুষঙ্গে কবি সমীর তাঁতী আদিবাসী যুবকটির নিথর শরীরী কাটাছেঁড়াকে এক ভিন্ন মাত্রার ব্যঞ্জনায় তাঁর তীক্ষ্ণ কলম দিয়ে দৃশ্যায়িত করেন যা আমাদের চেতনায়   তীব্র আঘাত করে। কবিতাটি মনে হয় এখানেই সফল

  

কৃতজ্ঞতা : ইত্যাদি,কবিতাপত্র, নভেম্বর,  ১৯৮৬ 




              পৌলমী চক্রবর্তীর দুটো মুক্ত গদ্য        


                 লকডাউন দৃশ‍্যকল্প


 বাজার থেকে বহুদিন পর পাওয়া গেছে একখানা নধর মুরগি। আমি আর মা আলোচনায় রত, কীভাবে ওটাকে বেশ তরিবত করে রাঁধা যায়। একটানা নিরামিষ খেতে খেতে মুখ পড়ে গিয়েছিল। এদিকে একঘেয়ে সুরে কেউ একটা ডেকেই চলেছে তখন থেকে, 'মাসি, ও মাসি'। 'কোন্ বোনপো আবার দরজায় দাঁড়িয়ে কে জানে', আমি ফোঁড়ন কাটি। পাশের বাড়ির ঋতা বৌদি দেখি চাল দিচ্ছে বারো-তেরো বছরের ছেলেটিকে। 

পরনে শতচ্ছিন্ন একটা শার্ট, ট্রাউজার্স তিন-চার জায়গায় ফেটে গেছে, কাঁধে একটা বিবর্ণ ঝোলা, মুখ শুকনো, চোখের কোণে পিচুটি, চুল উশকোখুশকো। ছেলেটি লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বৌদির সুডৌল হাতে ধরা চালের বাটির দিকে। একটু নাক টানে, বাঁ হাতের  উল্টো পিঠে নাকের সর্দি মুছে নেয়, এবার কাঁধের ঝোলাখানা মেলে ধরে। যতক্ষণ চাল বাটি থেকে ঝরে, তার শেষ দানাটুকুর পড়ে যাওয়াও সে একদৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে দেখে। আমি জানালায় উঁকি দিয়ে দেখতে দেখতে প্রমাদ গুনি- উফ! এই তো এবার আমাদের বাড়ির পালা। এমনিতেই গতকাল রাতে আড্ডা দিয়ে আজ উঠতে দেরি হয়েছে। দেড়টা বাজতে চলল। আমার মাংস কষাতে দেরি হয়ে যাবে। প্রচণ্ড বিরক্ত মুখে বাইরে যাই। ওই ছেলের আমার কাছে আর কী চাওয়ার থাকতে পারে! সে তো কারও খোঁজে আমার বাড়ি আসেনি। তার দরকার ছিল না আমাদের বাড়ির কারও কাছে কোনও দরকারে আসার। তবু আমি তাকে ঝামরে উঠি, 'কী হে? কী চাই এখানে?'

ছেলেটি আমার মারমুখো মূর্তি দেখে চমকে ওঠে। ভয়ে ভয়ে বলে, 'গত একসপ্তাহ ধরে কিছু খাইনি দিদি। ঘরে আমার একটা দানাও নেই।' এমন সময় ঘরের ভেতর থেকে শেফালি এসে জিজ্ঞেস করে, 'দিদি, মাংসে টক দই দেবে নাকি ভিনিগার?" আমার ভুরুতে বিরক্তির ভাঁজ বাড়ে। আমি শেফালিকে বলি, 'তুমি ভেতরে যাও। বলছি।' হঠাৎ একবার ছেলেটির মুখে চোখ পড়ে যায়। ইতিমধ্যে 'মাংস' শব্দটি ছেলেটির কানে গেছে। ছেলেটি জুলজুল চোখে একবার আমার, একবার শেফালির মুখের দিকে তাকায়। আমি অস্বস্তিতে পড়ি। এভাবে তাকিয়ে থাকলে কিছু না দিয়ে থাকা যায়!

 ঘরে ফিরে আসার পর মা বলেন, 'শুনেছি দেশভাগের পরে নাকি উদ্বাস্তুরা এভাবে দোরে দোরে দাঁড়িয়ে ভাতের ফেন চাইত। এই লকডাউনের ফলে দেশের এক বিশাল অংশের মানুষ প্রায় না খেয়ে দিন কাটাতে বাধ‍্য হচ্ছে। এখন হয়তো এভাবে প্রতিদিন আমরা দেখতে থাকব।' 

আমি বিরক্ত হয়ে বলি, 'রিলিফ তো প্রতিদিন দেওয়া হচ্ছে এখানে ওখানে। ফালতু আসে নাকি এরা কে জানে!'

শেফালি তখন কাঁচা মাংসের টুকরো জল থেকে চিপে চিপে গামলায় তুলে রাখছে। বাবা বললেন, 'দিয়ে দে দশ টাকা ছেলেটাকে।' আমি খুচরো নেই বলে শেফালির হাত দিয়ে বাইরে পাঁচ টাকা পাঠালাম। ততক্ষণে টক দই মাংস জারিত করতে শুরু করেছে।



                                  নৈশালাপ

'চলো আমরা অন‍্য কিছুর গল্প করি।' চারদিকে হানাহানি... শিশুর লাশ কবর থেকে খুঁড়ে ফেলে দেওয়া হচ্ছে সে অন‍্য ধর্মাবলম্বী বলে। 'তাতে কী! দেখো গাছে কেমন লাল বাগানবাহার ফুল ফুটেছে। 'দেখো হাজার হাজার অসহায় মজুররা না খেতে পেয়ে রওনা হয়েছে নিরুদ্দেশের পথে...'

'আহা ছাড়ো না ওসব! কেমন গভীর চোখ দুটো তোমার..চলো নিঃশেষে ডুব দিই একে অন‍্যের চোখে...'

'দেখো মাথার ওপর শুধু দাদাদের হাত ছিল না বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল মেয়েটা আজ মুখে রঙ মেখে কনে দেখা আলোয় দাঁড়িয়ে। তার জন‍্যে খোলা নেই কোনও চাকরির দরজা, তার জন‍্যে অপেক্ষা করে নেই কোন জোড় পরা সুন্দর যুবক। সে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা হায়নার অপেক্ষায়। যারা তার বুক তার তলপেট খুঁড়ে খুঁড়ে খাবে। একটা অন্ধকার কালো রাত কেটে গেলে সে তার ঠোঁটের ধেবড়ে যাওয়া রং মুছতে মুছতে ভাববে, মায়ের ক‍্যান্সারের ওষুধটা কেনার টাকা কোনও ক্রমে জোগাড় হয়ে যাবে।'

'আহ! তুমি বড় বাজে বকো! স্বচ্ছ নাইটির ভেতর থেকে তোমার শরীর যেন কোনও বতিচেল্লির সৌন্দর্য। আলোটা নিভিয়ে দাও। আর অবান্তর কথা নয়।।'







অলংকরণ: কুহেলী দেব রায় ও সুজয় দাম।