Tuesday, August 7, 2018


                              প্রচ্ছদ-''রিফিউজিস"
         ..........................................................................
   


কবিতা ক্যানভাস





এনআরসি,আসাম, ২০১৮

                     সপ্তর্ষি বিশ্বাস

এবার তবে গর্জে ওঠো
সিংহ-শাবক
মেষবালকের ছদ্মবেশে
আর কতকাল?
দুয়োরানির নোলক পরে 
কবেই ঘাতক
শান দিয়েছে অন্তরালে
দন্ত করাল।
হায়নারাও আজ কপালে
তিলকমাটি
প্রলেপ দিয়ে ওড়ায় নিশান
জনসভায়
রাজসভাতেও পাঠায় সেলাম
নিয়ম মতো
এবং তোমার বিকল গায়ে
মুহুর্মুহু
আরো গভীর বিষ-চাবুকের
মরণ-ক্ষত।
এবার তবে গর্জে ওঠো
সিংহ-শাবক
ঝর্ণাজলে এবার আপন
মুখটি দেখো,
দেখো তোমায় মেষবালকের
পোশাক দিয়ে
ভুলিয়ে রেখে যক্ষীরানি
আজন্মকাল
নাগড়া বানায় তোমার পিঠের
চামড়া দিয়ে
এবং যে সব হায়না ঘোরে
নাম লিখিয়ে
তোমার পাশে পরম সুহৃদ
মুখটি করে
তারাও যাবে রানির কাছেই
প্রসাদ পেতে
তোমায় ফেলে একলা একা
মরণ ফাঁদে
তাই এবারে গর্জে ওঠো
সিংহ শাবক
ণত্ত্ব ষত্ত্ব নেতার তত্ত্ব
দন্তে ছিঁড়ে
ঝাঁপিয়ে পর যক্ষীরানির
প্রাসাদ ঘিরে।।



দাঁড়িওয়ালা

           দেবাশিস সায়ন


কৃষ্ণকলির ছন্দপতন পাখির মতন
আকাশ ডায়েরি সমুদ্র কলম
লিখছ আজও যখন যেমন—
শমন পাঠায় ওরা, ঘন্টা বাজায় কারা ?
নাম নেই শুধু
তবু দিব্যি বাঁচি
গোত্র নেই জ্ঞাতি নেই
ব্রহ্মার শব্দশুচি ।
রুইতন হরতন চিরেতন কোথায় রে
আকাট বাউণ্ডুলে নাই নাই নাইরে।
ও দাঁড়িওয়ালা বাবু দেশাংশ লিখনি
রেখে গেছ  সাবেকি কল্পনা  —
তবে কেন বার বার পঁচিশে করাও জল্পনা।
এবার নাম দিয়ে যাও ওদের
যারা বাঁচে তোমার ডাকঘরে
চেনা অচেনার তকমা এঁটে খিদের পেটে নিত্য মরে।
দাঁড়িওয়ালা বাবু তোমার নাম আছে কি চিত্রগুপ্তের এনআরসিতে ?
না শুধু বিসর্জনে স্বপ্ন  বাজাও
বাঁচতে শেখাও আরশিতে।












ঘিরে ধরা পথ

              দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম


চারদিক থেকে ঘিরে আসছে পথ
বিনা যুদ্ধে অস্ত্রের ঝনঝনানি
তুমি কে আজ চিহ্নিত করবে নীতি
যা রেখেছো বুকে সব মিথ্যে।

জানালাগুলো নিজেই বন্ধ হচ্ছে
রৌদ্র হাওয়া আর নেই কোথাও
গুমোট এক গন্ধের নিচে দাঁড়িয়ে
কেউ অন্ধকারে লিখছে ত্রিকাল।

যে বলছে অন্যায়, ঘোরতর খুব
আগুন ছুঁয়ে বলছে সে বারবার,
তাকে দেখায় কেমন একা আজ
সদা ঈশ্বরের মতো, যদিও নিরীহ

চারদিক থেকে ঘিরে আসছে পথ
হুঙ্কারে খসে পড়ছে জীর্ণ বাকল
এতোদিন পর তুমি জেনে নিচ্ছো
বৃথা জপেছো বিশ্বস্ততার শপথ


       


        সংলাপ
           

                   নীলাদ্রি ভট্টাচার্য


দৃষ্ট-পৃষ্ঠায় তাকিয়ে আছে শব্দের ছবি
কয়েকটি সিঁড়ি বেয়ে রোজ তার অপরূপ সংলাপ
ভয়শূন্য করে দুটো কথার উপন্যাস।
আমি বিকেলবেলার দ্বন্দ্বী
সন্ধি বাজারে বিক্রি করি
পেট ভরে গিলি জলে ভেজা অভিনয়।
ছায়ার কুঁড়েঘরে কাঁপা মহীরুহ স্নান
সম্পর্কের নীরন্ধ্র অশ্বত্থ শেকড়
বাঁচিয়ে রাখা মানুষের মুখোশধারী হিসেব
দর্শন  আকাশের আজন্ম ঝুলন্ত বাতাস।





                               
                                           ***


-------------------------------------

প্রচ্ছদ -"রিফিউজিস",শিল্পী-কোয়াইস আল-সিন্দি, ছবি (সৌজন্যে ইন্টারনেট)।

লেখা পাঠান- sfulinga.2007@gmail.com 

ব্লগ ঠিকানা- sfulinga.07@blogspot.com 

                           ----------------------------------------------------



                    

Wednesday, August 1, 2018

গল্প 
........



লড়াই

শর্মিলী দেব কানুনগো


কদিন থেকে প্রচন্ড অস্থির শ্যামল বাবু। কি যে হবে.. নাম সব ঠিক ঠাক থাকবে তো? আজ সকালে তড়িঘড়ি ছুটলেন সেবা কেন্দ্রে। নিজের চোখে ছবি সহ সবার নাম দেখে তবে স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল। উফ যা গেল কদিন ধরে। ফেরার পথে হাতে  ইলিশ আর দৈ মিষ্টি নিয়ে বাড়ি এলেন। ভারতীয় হওয়ার আনন্দ উদযাপন। সিঁড়ি থেকে হাঁক দিলেন,
—ক ই গো কোথায় গেলে.. এদিকে এসে নিয়ে যাও এটা। আর জমিয়ে রান্না কর তো আজ...
  বৃদ্ধ বাবা একবার তাকালেন শ্যামলবাবুর দিকে। উচ্ছাসহীন ভাবে।  এসব বড্ড বিরক্ত লাগে শ্যামল বাবুর। এরা যে কি.. আনন্দ কে গ্রহণ করতে যেন অসুবিধা এদের। যাগগে.. ওসব ভেবে লাভ নেই। বরং আজ অনেকদিন পর শান্তিতে খাওয়া যাবে।
    আজ শ্যামল বাবুর বাবা বড্ড অশান্ত হয়ে আছেন। ফোনে খবরাখবর নিচ্ছেন সবার। খেতে বসে বললেন
—বৌমা আজ ইলিশ নামবে না গলা দিয়ে.. আমাকে আর দিও না। হাইলাকান্দির বিরাজের আর হাফিজ দের পরিবার বড় সংকটে। আমি কি করে ভুলি বৌমা... এক অন্ধকার রাতে যখন আমার গাঁয়ে দাঙ্গার আগুন জ্বলছিল, তখন  নামমাত্র দামে জমি জিরাত বিক্রি করতে হয় আসলাম  আলির  কাছে। রাতের অন্ধকারে নাবালক সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে এপারে পালিয়ে আসতে বাধ্য হই। কিন্তু ঐ রাতে আমাকে নদী  পেরোতে সাহায্য করে আসলাম এর পরিবারের লোকেরা। কই ওরা তো সেদিন ইলিশ খেয়ে নিজেদের আনন্দ কে উদযাপন করেনি। ওরা তো সেদিন মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছিল আমার কাছে।  এপারে এসে অসহায় অবস্থায় আশ্রয় নিয়েছিলাম পিসতুতো ভাই  বিরাজদের বাড়িতে।যতদিন না কাজকর্ম পেলাম, ওরা ততদিন  হাসিমুখে আমার পরিবারের ভার বহন  করল। জায়গা জমি কিনে থিতু হতে সাহায্য  করল হাফিজ। সম্পর্কে  আসলাম এর পিসির ছেলে। কিন্তু ওরা কেন আমার জন্য এতকিছু করল বৌমা? এতে ওদের কি লাভ হল বল তো?
শ্যামল বাবু  অধোবদন। ইলিশ এর স্বাদ আচমকা চলে গেছে। বাবা বলে চলেছেন...
—বৌমা... জীবনের যখন সুযোগ পাবে নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রমাণ করবে। এতে নিজের কাছে নিজের সম্মান বাড়বে। ছিন্নমূল দের একটাই জাত।প্রজন্মের পর প্রজন্ম ওরা একই পরিচয় বহন করে। ওদের শিকড়ে মাটির বন্ধন থাকে না। ওদের জীবন যেন জলজ উদ্ভিদের জীবন। তাই ওরা প্রশাখা দিয়ে একজন আরেকজনকে আঁকড়ে ধরে বাঁচে। আর ঝড় ঝঞ্ঝা বান থেকে বাঁচতে হলে একে  অপরকে আঁকড়ে  ধরে বাঁচা ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই।কারণ আমরা কেউ জানি না জীবন কখন কাকে কোন দিকে ঠেলে নিয়ে যাবে।
 
শ্যামল বাবু র গলা দিয়ে নামছে না আর ইলিশ মাছ। মনে পড়ছে সব পুরনো দিনের কথা। হাইলাকান্দির সেইসব প্রতিবেশী মানুষরা কেমন আছেন যারা আপদে বিপদে সব সময় পাশে ছিলেন বিশাল ছায়া দেওয়া  গাছের মত।  কি করে আজ তিনি সব ভুলে গেলেন। বড় লজ্জা করল তার। এতটা অমানুষ  তিনি হতে পারবেন না। এই অস্তিত্বের সংকটময় দিনে এদের পাশে না  দাঁড়ালে যে তিনি  ঋণগ্রস্ত থেকে যাবেন আজীবন। মুখে বললেন,

—কাল আমি একবার  হাইলাকান্দির পুরনো বাড়িতে যাব। কদিন ছুটি নিয়ে ওদের পাশে থাকি  গিয়ে । যতটুকু পারি সাহায্য করব ওদের এই সংকটে। মুষ্টিমেয় কয়েকজন এর বিবেকহীন কাজ কর্ম  আর অমানবিক স্বার্থপরতার  শিকার  হচ্ছে এক বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী।  এদের পাশে আমি দাঁড়াব বাবা। বাবা বাঁহাতে চোখটা মুছলেন।
 
আজ বাড়ির বেড়ালটার যে কি হলো.. ইলিশ মাছ ছুঁয়ে ও দেখল না।


..........
কবিতা
.........



যাযাবর সন্তান


ভাস্কর জ্যোতি (আলোর জীবাশ্ম)



সদ্যোজাত এক শিশু,
অগ্নি থেকে নৈঋত, নৈঋত থেকে ঈশানে ছুটে যায়।
সে যাযাবর।
সে ঈশ্বর।

নিষাদের অন্তিম অস্ত্র হারিয়ে গেলে,
হলুদ সূর্য লক্ষ্য করা ছুটে চলে,
আরো এক নতুন পৃথিবীর সন্ধানে।
কিন্তু তবুও সে জাতিস্মর।

ভাঙা ছাইয়ের সঙ্গে মিশে গেছে,
হাজার পল্টন প্রহরী।
ভূমিপুত্র রব তোলে।
সোঁদা গন্ধকে আপন করে,
মানুষের সমাধি গড়েছে তাতে।

ভাঙা পাতিলের এক রাশ শব্দের মাঝে,
জোরে চিৎকার দেয় সে শিশু
 "আমি উদ্বাস্তু নই,
আমি যাযাবর,
আমিই ঈশ্বর"


ছবি-ইন্টারনেট



লেখা পাঠান- sfulinga.2007@gmaol.com

Sunday, July 29, 2018

খো লা ক ল ম
.....................

এনআরসি আর কিছু প্রশ্নচিহ্ন


সোমাভা বিশ্বাস



-আইজও অত দেরি করলায়, রুজ রুজ কিতা শুরু করসো সীমা?

-মাসি, এনআরসিত নাম উটসে না আমার আর ননদের, কইসলাম নু আইজ আইতে দেরি অইব,আমরার বস্তিত যারার নাম উটসে না সবে আইজ মিটিং কররা, নাম না উটলে ইন্ডিয়াত থাকতে দিত নায় কইরা হকলে...  

-শুন, ইতা আন্দু মাত মাতিও নায়, জেবায় যাওয়ার যাও, আমার ঘরো কামে আওয়ার টাইম ঠিক রাখতে লাগব। তুমার নাম উটসে না, ননদের নাম উটসে না, ইতা আমারে শুনাইয়ো নায় আইয়া...

ক্রিং ক্রিং...ফোনের আওয়াজে গৃহকর্ত্রী থমকান,কাজের মেয়ে সীমাকে ছেড়ে মোবাইলে মনোযোগ তার,

-হ্যা বাবাই বল, গত সপ্তাহে ফোন করলি না কেন?শরীর ভাল আছে তো? নিউ জার্সির ওয়েদার কেমন? বরফ পড়ছে নাকি? আগের দিন বলছিলি খুব ঠাণ্ডা...

-উফ মা, অত কথার উত্তর দেওয়ার মত সময় এখন আমার নেই, তুমি বাপীকে বোলো এনআরসির লিস্টে আমাদের নাম উঠেছে লিখে যে ওয়াটস্যাপ মেসেজ করেছিল, দেখেছি। রিপ্লাই করার টাইম পাইনি।

-ওহো, আচ্ছা। অফিসে খুব কাজের চাপ চলছে বুঝি?

-না না, অফিস তো এখন ছুটি। আমরা নিউ ইয়ার সেলিব্রেট করতে ভেগাস এসছি লাস্ট উইক। আচ্ছা শোনো, আমার, রিয়ার আর টুবাইয়ের নামের বানানে ভুল আছে কিনা চেক করতে বোলো তো বাপীকে। আমাদের স্কুল ফ্রেন্ডসের গ্রুপে দেখলাম অনেকে লিখেছে তাদের নামের বানানে ভুল আছে।

-না না তোদের তিনজনের নামের বানান তো ঠিকই আছে, তোর বাপী বলছিল। আচ্ছা, তোরা এবার ভেগাস গেলি কেন রে? ছুটি পেলি যখন, বাড়ি এলেই তো পারতি, টুবাইটাকে কত বছর দেখিনি...

-আরে, এখন ইউএস ছেড়ে বেরবো কি করে?বাপীকে বললাম তো লাস্ট মান্থে এখানে গ্রিন কার্ডের জন্য অ্যাপ্লাই করেছি, তোমাকে বলেনি বাপী?

-ওহ, গ্রিন কার্ড! নাহ না... আমায় তো কিছু বলেনি তোর বাপী। গ্রিন কার্ড...মানে তোরা ও দেশেই সেটেল করবি...আর ফিরবি না...

-উফফ শোনো মা, এত সেন্টিমেনটাল হয়ও না তো। দেশে কী আছে, কিসের জন্যে ফিরব এত ভাল কেরিয়ার প্রসপেক্টস ছেড়ে, এত সুযোগ সুবিধে ছেড়ে...বলতে পার? হ্যাঁ? কি বললে?নিজের দেশ তো নিজের দেশই? ওসব ব্যাকডেটেড কথাবার্তা কেন বলছ বলত! দেশে ফিরলেও তো সেই ব্যাঙ্গালোর, হায়দ্রাবাদ নয়তো মুম্বাইয়ে থাকতে হবে। তোমাদের সঙ্গে বাড়িতে তো আর থাকছি না। আসামের কি অবস্থা! ওখানে মানুষ বাস করে কী করে কে জানে...চাকরির কোনো স্কোপ নেই, বাচ্চার পড়াশুনার ভাল স্কুল নেই,সেফটি সিকিওরিটি, বেসিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার কিচ্ছু ঠিক নেই। কাগজে তো সবই পড়, তবু দেশে ফেরার কথা বলছ? বরং তোমরা এখানে এসে থেকে যাও কটা মাস। নেক্সট ইয়ার প্ল্যান কর। সব ঠিক করে জানিও, টিকিট কেটে দেব আমি...ঠিক আছে?শোনো, পরে কথা বলব, এখন ফোন রাখছি। তুমি কিন্তু মনে করে বাপীকে বোলো এনআরসির লিস্টে আমাদের নামের স্পেলিং গুলো ডাবল চেক করে নেয় যেন...

***

এনআরসি নিয়ে লিখতে বলায়, একটু থমকে গেছিলাম। কী লিখব? নাগরিকপঞ্জি হওয়াটা নিশ্চয়ই দরকার কিন্তু আর সকলের মতন আমার মনেও যে এনআরসি বা নাগরিকপঞ্জি নিয়ে কতগুলো প্রশ্ন রয়েছে। ওপরের কথোপকথনটিতে আমার মনের অনেক প্রশ্নের মধ্যে মাত্র একটি তুলে ধরেছি। কিন্তু এছাড়াও আরও কতই প্রশ্ন মনে ঘুরপাক খায়- এত জন মানুষের ভাগ্যে কী অপেক্ষা করে রয়েছে? কেন আসামের বাঙালি এবং অন্যান্য কিছু জনগোষ্ঠীর মানুষের নাগরিকত্ব প্রশ্নচিহ্নহের মুখে? জাতীয় নাগরিকপঞ্জির প্রথম খসড়ায় পাহাড়প্রমাণ ভুলের কারণ কী? এত জনের নাম (যাদের নাগরিকত্ব নিয়ে কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না) অনুপস্থিত কেন? কখনো গোটা পরিবারের নাম বাদ, তো কোথাও সন্তানের নাম রয়েছে, বাবা-মায়ের নাম অনুপস্থিত- লিগ্যাসি ডাটা দাখিল করার অর্থ কী তবে? অনুপ্রবেশকারী কারা,তা নির্ণয় করার জন্যে আসামের ভৌগলিক কাঁটাচেরার ইতিহাস সঠিকভাবে জানা উচিৎ নয় কি? ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে মানুষকে লাঞ্ছনা,অত্যাচার করা কেন? যাদের নাম নাগরিকপঞ্জীর প্রথম খসড়ায় নেই তাদের অনেককে এনআরসি কেন্দ্রগুলিতে ডেকে নিয়ে নানান হেনস্থা করা হয়েছে, এর কারণ কী? দেশের মাটিতে পা দিতে ইচ্ছুক নন এমন প্রবাসীদের নাম নাগরিকপঞ্জিতে উঠে যায় অনায়াসে, কিন্তু আজন্ম দেশে থাকা সেই সব খেটে খাওয়া মানুষের, বিশেষ করে যারা শিক্ষার আলোয় আসার সুযোগ পাননি, অর্থকষ্টের মধ্যে রয়েছেন যারা, তাদের মনের মধ্যে যে চূড়ান্ত আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে, নিত্যদিন জীবন সংগ্রামের পাশাপাশি এনআরসি কে ঘিরে যে অনিশ্চয়তা, দুশ্চিন্তার মধ্যে তারা রয়েছেন-তাদের স্বাস্থ্যের যে ক্ষতি হচ্ছে, তার কী হবে? নাকি ‘স্ট্রেস’ নামক ব্যাধিটা নিম্নবিত্তদের হয় না? এনআরসিকে ঘিরে বাক স্বাধীনতা খর্ব করা হবে কেন? উনিশের ভাষাশহীদদের সন্তান আমাদের প্রজন্মের অনেকের এনআরসি নিয়ে একটু ভাবারও সময় নেই। নাকি ইচ্ছে নেই? জানিনা ঠিক। আমরা অনেকে মনে করি, ওসব আমাদের চেয়ে যারা বয়সে বড়, জ্ঞানে, অভিজ্ঞতায় প্রাজ্ঞ, তাদের মাথা ঘামানোর ব্যাপার। আচ্ছা, ১৯৬১তে কমলা দাসের বয়স কত ছিল? তিনি বা তাঁর নবীন সাথীরা যদি পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নিঃস্পৃহ থাকতেন তাহলে কী হত?

প্রশ্নগুলো আরও অনেকের মতই আমাকেও ভাবিয়ে তোলে। আসাম থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, লন্ডনের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতেও এসব প্রশ্ন মনে ঘোরাফেরা করে। কখনো চমকে উঠে ভাবি, স্যার ক্যাম্পবেল, লর্ড কার্জন, স্যার র‍্যাডক্লিফ, লর্ড মাউন্টব্যাটন- দেশকে কেটে চিরে ভাগ করার ইতিহাসের সঙ্গে এইসব ইংরেজ নামগুলোই জড়িত নয় কি? আমার এখনকার আবাস ইংল্যান্ডের মাটিতে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রয়েছেন এরা। আর তাদের অমর কীর্তি সেই দেশ ভাগের জের আজও অশান্ত করে রেখেছে আমার জন্মভূমিকে।

সাম্প্রদায়িকতার, ভেদাভেদের বিষ বৃক্ষটি রোপণ করা হয়েছিল ব্রিটিশ আমলেই। কিন্তু দেশ স্বাধীন হবার ৭০ বছর পরও আমরা ভালো নেই, কেন?যাদের ওপর আমাদের ভালো রাখার দায় বর্তায়,তারা কেন আমাদের সমস্যাগুলোর সুষ্ঠু সমাধান করতে অপারগ? আমাদের মনে রাখতে হবে,অসমীয়া মানেই ‘বাঙালি খেদা’ নয়। ‘বাঙ্গাল’মানেই জেহাদি নয়। কিন্তু ব্রিটিশ মুক্ত ভারতে বারে বারে দেখা গেছে, রাজনীতি (সে যে রঙ, যে চিহ্নই বহন করুক) মানেই বিভাজন। রাজনৈতিক দল গুলির ছায়ায় পরিপুষ্ট ধর্মীয় সংগঠন মানেই দ্বেষ,দ্বন্দ্ব। ৬০ এর দশকের রাউরকেলা, রাঁচি,জামশেদপুরের সংঘর্ষ, ৭০ এর ভিওয়াদি দাঙ্গা, ৮০ র মোরাদাবাদ, বিহারশরিফের মৃত্যুমিছিল,আসামের নেলি হত্যাযজ্ঞ, ৮৪ এর উত্তাল দিল্লী,বাবরি মসজিদ-রাম জন্মভূমিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক বিতর্ক ও সঙ্ঘাত, ৯০ এর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরের তীব্র সঙ্ঘাত, ২০০২ এর গুজরাত রায়ট...রাজনীতির ছায়া সবখানে।রাজনীতির একটি প্রধান লক্ষ্য জনকল্যাণ। কিন্তু রাজনৈতিক দল, নেতারা যদি বিভিন্ন জাতের,ভাষার, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখতে সাহায্য করত, তাহলে আসামে আজ এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হত কি? অবশ্য ভাববার কথা এটাও, ব্রিটিশ-মুক্ত ভারতে বিভাজন-মুখি রাজনীতির জন্য দায়ী কী?

সেই কবে, ১৯৬০ এর দশকে সাংবাদিক সেলিগ হ্যারিসন ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, ভারতে ভাষা সংঘর্ষের জন্যে আগামীতে অপেক্ষা করে রয়েছে ভয়ঙ্কর কিছু দশক। তাঁর ভবিষ্যৎবাণী নির্ভুল হওয়াটা ঠেকানো কি অসম্ভব?

আসলে, প্রশ্ন করা যতটা সহজ, উত্তর পাওয়া ততটাই কঠিন।  

দাঙ্গা, সংঘর্ষের সময় অনেক ক্ষেত্রেই রাজনীতির যোগ দেখা গেছে। সব ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। কিন্তু আশার কথা,দাঙ্গা, অসহিষ্ণুতা পেরিয়ে জাতি, ধর্ম, ভাষার বেড়াজাল পেরিয়ে, পরস্পরকে শ্রদ্ধা করে সম্প্রীতিকে ফিরিয়ে আনতে সাধারণ মানুষই সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন বারে বারে।        

***

(এই প্রবন্ধের লেখিকা প্রবাসী। তবে নিজের মাতৃভূমিতে প্রবল ভাবে ফিরতে চাওয়া এক প্রবাসী। মানুষের মনুষ্যত্বের ওপর যার অটল বিশ্বাস। প্রথম বিশ্বের দেশগুলোর বিত্ত বৈভবে যে মজতে পারে নি। মা, বাবা, ছোট ভাই-  পরিবারের সকলের নাম এনআরসির প্রথম খসড়ায় থাকলেও কেবল তার নামটিই কোন দুর্বোধ্য কারণে বাদ পড়ে গেছে। এত অনিশ্চয়তা, এত প্রশ্নের ঝড়ের মধ্যেও স্বপ্নরা জায়গা করে নেয় কোন জাদুবলে।বৈধ নাগরিক হিসেবে তার জন্মভূমিতে শিগগিরি পা রাখার স্বপ্ন সে দেখে চলেছে।)

                                 
                                              ####

.............
কবিতা
.............

সময়

দেবাশিস সায়ন

জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের আবেদন রাখতে গিয়ে পৃথিবীটা দেশ নামক কাঁটাতারে বিভক্ত।
তবুও, সময়ে সময়ে উন্মোচিত হয় নিষ্পেষিতের হাহাকার।

কেন?

শান্তি, ঐক্য, সৌহার্দ্য ও ভালবাসার বাড়তি বৈ কমতি নেই এখানে।
কিন্তু, বৃহৎ মঞ্চে রাজনৈতিক নাটিকার কুশীলবরা থাকে লোকচক্ষুর আড়ালে।

কেন?

আমজনতা এই "কেন" এর উত্তর খুঁজতে খুঁজতে কালের বীভৎসতা পেছনে ফেলে স্বজনের লাশ মাড়িয়ে হয় দেশান্তরী।






ছবি-ইন্টারনেট

sfulinga.2007@gmail.com



Thursday, July 26, 2018

  খো  লা  ক  ল  ম

----------------------------------

                         

                            'নাম আছে?'

                       

                            রম্যাণি চক্রবর্তী 


বছর ছয়েক আগের কথা হবে। সময়টা বৈশাখের ধারে কাছে। স্থান এন.আই.টি শিলচর। চার দিক ঘেরা সেই জায়গায় উদযাপিত হচ্ছে 'পোসোআ', আসন্ন নববর্ষ উপলক্ষে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক নাম। সেখানে দেখলাম শহিদ বেদি। সেখানে দেখলাম 'জয় আই আহোম' লেখা গামোছা উত্তোলন। সেখানেই দেখলাম সবাই দাঁড়িয়ে উঠে একটা গান গাইল। 'আমার অহমর জাতীয় সঙ্গীত', পাশের মেয়েটা ফিসফিস করে জানিয়ে দিয়েছিলো। বিহুর উৎসব আগেও দেখেছি। অপরূপ ছন্দের গান আর তার সাথে তাল মিলিয়ে নাচ। মুগা রঙের সুতো আর 'পেঁপা' তে যেন আনন্দ উপচে পরে। কিন্তু সেবারে একটু খচখচ করছিল। শহিদ বেদি আর হাওয়ায় উড়তে থাকা গামোছার আড়াল থেকে যেন উঁকি মারছিলো আসাম আন্দোলন, নেলী, ৬১, ৮৫। নববর্ষের আগ মুহূর্তে সেটাই অসমীয়া জাতীয়তাবাদের সাথে প্রথম পরিচয়।

২০১৭ সাল।  ৩১ ডিসেম্বর যখন পৃথিবীর সবাই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নতুন বছরের অপেক্ষা করছে, তখন আসামের, বিশেষত বাঙালিরা, ব্যস্ত ছিল হাজেলা বাবুর জাবদা খাতায় নিজেদের আসাম বাসের বৈধতা খুঁজতে। এর আগেই কিন্তু মৃত্যুমিছিল শুরু হয়ে গেছিল। দুলু শব্দকর কে মনে পড়ছে? ২০১৫ সালে তাকে ডিটেনশন ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানেই মারা গেছিলেন। তারপর আরো অনেকে। হানিফ খান, রতন রায়, সুব্রত দে, সহিমুন বিবি, কিছু নাম পাওয়া গেছে , বেশির ভাগ নামই পাওয়া যায়নি, পাওয়া যায় না। এদের কেউ কিন্তু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক নয়। এদের কাছে অর্থ বা শিক্ষার বর্ম নেই। এদের কাছে জমির পাট্টা থাকে না, মাধ্যমিকের মার্কশিট থাকে না। আর খুব বয়স্ক হলে তো জন্মের সার্টিফিকেট ও থাকে না। যাদের রোজ রাতে শুয়ে পরের দিন হাঁড়ি চড়বে কিনা ভাবতে হয়, তাদের পক্ষে তো উকিল নিয়ে ট্রাইবুনালে মামলা লড়ার ক্ষমতা থাকে না! দিন মজুর দুলু বাবু তো ভাবতেই পারেননি যে একজন ভিখিরী-সম দিনমজুর কে পুলিশ এসে তুলে নিয়ে যেতে পারে!তাও সেটা হয়েছে!

গত নির্বাচনের সময় আমাদের রাজামশাই অসম গণপরিষদের সাথে জোট এবং ডিটেনশন ক্যাম্প ভাঙার প্রতিশ্রুতি দুটোই একসাথে করেছিলেন। আপনি বাঁচলে বাপের নাম। পদ্মফুলে ছাপ দিয়ে সবাই নিশ্চিন্ত হয়ে বসেছিল, ' হউ বাঙাল হকল মরবো। যাউক শত্রু পরে পরে।' তেলের ঝাঁজে খেয়াল ছিল না যে অসমীয়া উগ্র জাতীয়তাবাদের কাছে বাংলায় কথা বললেই 'কেলা বঙ্গাল', সে কিন্তু তখন বাবন-যবন ভেদ করে না! তারপর যখন তেলের খেমতা ফুরোলো, ঘুম ভেঙে দেখা গেলো যে হাতে রইল পেন্সিল! বাদল অধিবেশনে বিরাট হিন্দু যুগপুরুষ  অ্যান্ড কোং কিন্তু নাগরিকত্ব বিল পেশ করছেন না। সাদা কাগজে নামের লিস্টি পৌঁছে যাচ্ছে নানা জায়গায়। লক্ষাধিক নাম বাদ পড়বে।

আর তারপর আমরা সবাই হয়তো দেখবো একদিন যে আমাদের এখানেও 'auschwitz' তৈরি হচ্ছে। গোয়ালপাড়ায় স্থায়ী ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরির খবর বেরিয়েছে। ডিটেনশন ক্যাম্প এবং কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পে খুব বেশি তফাৎ পাওয়া যাবে কি ? বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র তৈরি করবে হয়তো বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্রহীনের দল। 'জাতি-মাটি-ভেটির' আস্ফালন কি আদৌ প্রাণে বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও দেবে?

তাই আমাদের কাছে আজ সবথেকে ভয়ের প্রশ্ন -            'নাম আছে?'
                                    ###          



                        ..................
                              ।। কবিতা।। 
                                      ...............

সময়

রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ

লুটেরা কেড়ে নিচ্ছে আত্মসময়
সমাহিত আলোর পাটাতনে রংবাজ
গিয়ার বদলে হেঁটে চলছে
বিস্ময় বালিকার ছায়া...

অন্ধকূপ ছুঁয়ে নেমে আসে
বোহেমিয়ান চিৎকার...
             
                                     ***



ছবি-ইন্টারনেট

Monday, July 23, 2018

প্রগল্ ভ  সময়ে ''বাঙালির গান''
........................................

তূর্য  চক্রবর্তী 


"...গান তুমি হও
জীবন বিমুখ গানের সমকালে
বাঁচার লড়াই বাঁচাও আমায়
তোমার তালে তালে..."
                 --- কবীর সুমন

এই মুহূর্তে অসমের বাঙালির  মরণ- বাঁচন দশা।  কালবেলায় দাঁড়িয়ে গান অন্ততপক্ষে  এ রাজ্যে নিছক বিনোদনের মাধ্যম হতে পারে না।

"বাঙালির গান" কথাটি শোনা মাত্র অনেকের কপালে ভাঁজ পড়তে পারে। তৈরি হতে পারে বিতর্কের ক্ষেত্র। বর্তমানে অগ্নি-পরীক্ষার মুখোমুখি   বাঙালির একান্ত নিজস্ব বেঁচে থাকার গান থাকবে না, এ কথা কেউ আশা করি  বুক ঠুকে বলতে পারবে না ( শুধু উগ্রজাতীয়তাবাদী ছাড়া)।

গান বরাবরই মানুষের কথা বলে । সোজা কথায়, গান লড়াইয়ের অক্সিজেন জোগায়। হেমাঙগ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরীরাতো গান দিয়ে মানুষের মনের বন্ধ দরজায় কড়া নেড়েছিলেন।
   
বরাকে এই মুহূর্তে  যে গান-বাজনা হচ্ছে,তা এখনও বিনোদনের পর্যায়ে আছে বলে মনে হয়। কারণ, গান হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু সময়ের গান কই?
যে গানে বিপন্ন মানুষের কথা থাকবে। থাকবে শেকড়ের ঘ্রাণ। আতংকের কালো লোমশ হাতকে কেটে ফেলার কথা চিৎকার করে বলবে যে গান। না, এই গান এখনও তৈরি হয়নি।

অসমীয়ারা অন-অসমীয়াদের  থেকে এগিয়ে  থাকার কথা উঁচু গলায় বলেন। আর এই কথাটা তাঁরা বলেন কিন্তু  সংস্কৃতির ওপর জোর দিয়ে । প্রতিবার বিহুর সময় ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় মঞ্চে মঞ্চে খুব গান হয়। যেগুলো তাঁদের নিজস্ব কম্পোজিশন। সেখানকার স্থানীয় শিল্পীরা এ সব গানকে মাথায় তুলে রাখেন।

কিন্তু বরাকে স্থানীয় গানগুলো মার খাচ্ছে। মঞ্চে এগুলো গাওয়ার রিস্ক নিতে চান না স্থানীয় শিল্পীরা। ফলে নিজেদের গান দিয়ে প্রতিপক্ষের মুখে ঝামা ঘষে দেওয়াটা হচ্ছে না। স্থানীয় সুরকার-গীতিকাররাও উৎসাহ হারাচ্ছেন।

বাংলা গানের মনে হয় এতটুকু ক্ষমতা আছে যে যারা বাঙালিকে পদানত করতে চায় তাদেরকে মুখ আর মুখোশের পার্থক্যটা বুঝিয়ে দিতে পারবে। এই বিপন্ন সময়ে নিজেদের গান লড়াইয়ের  অন্যতম  মাধ্যম  অতি অবশ্যই হতে  পারে। তবে কোন গান গাওয়া হবে বা তৈরি করা হবে, সেটা  শিল্পীদের সবচেয়ে আগে ঠিক করতে হবে।

  চিরবন্ধু রবীন্দ্রনাথ  । তাঁর গানকে এই দুর্দিনে অাঁকড়েতো ধরতেই হবে। তবে বরাক বা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালিকে নিজস্ব রবীন্দ্রনাথ আগে তৈরি করতে হবে। যাতে স্বভূমে বাঙালিকে পরবাসী করার ফন্দি যারা  অাঁটছে তাদের জব্দ করা যায়।

কিন্তু যাঁরা রবীন্দ্রসংগীত করেন তাঁদেরও এখানে বড় একটা দায়িত্ব রয়েছে। কারণ, অনেক সময় স্থান-কাল বিচার না করেই কিছু শিল্পী রবীন্দ্রসংগীত করেন। কয়েক বছর আগে শিলচরে যেমন বসন্ত উৎসবে এক শিল্পী গাইলেন "ঝর ঝর মুখর বাদর দিনে''। বুঝুন!

শিল্পী সংগ্রামী হেমাঙগ বিশ্বাস তাঁর "রবীন্দ্রসংগীতের বিচার, বিশ্লেষণ ও ব্যবহার " প্রবন্ধে লিখছেন -- ''...এই সেদিন AITUC আয়োজিত বিরাট ট্রেড-ইউনিয়ন কংগ্রেসে গিয়ে দেখি হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গাইছেন, 'দিনের শেষে ঘুম দেশে...'। একবার কল্পনা করুন, শ্রমিক মেহনতি মানুষের বিরাট সমাবেশে এককালের প্রগতিবাদী,  IPTA - এর হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গাইছেন এমন একটি গান, যার সাথে স্থান-কাল-পাত্রের কোনো সমপর্কই নেই!..."

আবার এর বিপরীতেও উদাহরণ আছে। অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের মুখে মুখে ফিরত রবি ঠাকুরের গান। ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা নিওটো বধ্যভূমিতে যাবার আগে রবি ঠাকুরের গানই গেয়েছিলেন। বোঝাই যাচ্ছে রবীন্দ্রসংগীতে কী শক্তি আছে। অসমের বাঙালিকে এই শক্তিটা কাজে লাগাতে হবে।

আর কথা নয়। এবার জোট বেঁধে বেঁচে থাকার গান গাওয়ার পালা। তাই  কী গান বাঙালি গাইবে তা  বাঙালিকে ঠিক করতে হবে। গাইতে হবে সময়ের গান। আর তখনই ইটের বদলে পাটকেল ছোঁড়া যাবে কুচক্রীদের। তাদের চোখে অাঙুল দিয়ে দেখানো যাবে যে সত্যি-
"...আকাশ জুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয়।"


                                                  ##


।।কবিতা।।

গৃহতল
...........


নীলাদ্রি  ভট্টাচার্য

আছাড় খাচ্ছে মাটির গন্ধে আমাদের জন্ম আশ্রয়
পুরাতন গৃহের আয়োজন তেপান্তরের মাঠে উধাও পাখি।
জল মাখা বিণুনির সূর্যাস্ত ভেজা শব্দ
সন্ধ্যা
অবয়বশূন্য নদীমাতৃকা।
এই সব  স্মৃতিকথার আবেগ জড়িয়ে ধরে
আমাদের গ্রাম শহরের  ঠাণ্ডা বাতাস।

নিরিবিলি বৃষ্টি  কুড়িয়ে রাখা মানুষের ছায়া
সুরক্ষিত  মর্ম-মর্যাদা
রোদে রোদে ভ্রাতৃত্ব টানাপোড়েন
সন্তর্পণে  পুড়িয়ে  রাখে মিলনভূমির কান্না।


ছবি-ইন্টারনেট

সম্পাদক- বিশ্বরাজ ভট্টাচার্য
 im.biswaraj@gmail.com


Wednesday, February 14, 2018

ভালবাসার ক্যানভাস



নিরক্ষরেখা

রুমেলা দাস
---------------
আমি আর বিচ্ছেদ,
আজ একই চাদরের তলায়
ফিনফিনে ভালোবাসা।
রঙিন গোলাপ মেখে অতীত সেজেছে অষ্টাদশী
শিথিল হিল্লোল মাড়িয়ে যাচ্ছে
প্রেমকাতর তীর।
কাম, লোভ বড় তুচ্ছ
হিয়াতেই প্রতিপদের প্রবেশ
বিচিত্র এ কপাটে চুমু দিয়ে যায়
শাপ প্রবণ কোনো বিরহীর মতো,
প্রতিপ্রশ্ন তৈরি রেখো তুমি
এ জীবনের মন্থর প্রহর কাটিয়ে
আরো একবার
আরো কোনো সন্ধ্যায়
দু চুমুক একসাথে স্পর্শ করবো
হিমবাহ ক্যানভাসে।।




অধরা শব্দের মাপ...

নীলাদ্রি ভট্টাচার্য 
---------------------
আমি আটকে রেখেছি বোকার মতো এক অধরা পাগল নিগূঢ় আলাপ |
ভাতের দানায় অবলম্বন তোমার হাতের গন্ধ,
রোজ রোজ চোখের কালো নির্জন ঘরে 
আমার ভিক্ষান্নের ক্ষুধা বসন্ত বাতাস,শব্দের মাপা দুমাত্রার কৌতূহলী  আবেশে আমিত্বের দাগ মুছে রাখে।



প্রেম 

দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম
--------------------------------
(ক) 
যেন তুমি অজ্ঞাতসারে অন্ধকারকে দিলে শেষ প্রহরের জ্যোৎস্না
ছড়ালে চাঁদের মায়া, মায়াবী পরশ শাদা চাদরে বোনা।
বুকের গভীরে রাখলে হাত, নির্ঘুম স্বপ্নের ফর্দ করে কেটে গেল -
আমার গাণিতিক যোগের অধিক শত সহস্র এক রৈখিক রাত।
যেন তুমি নিজেই প্রেম, দিক বিদ্বিক ফেরা অস্থিরতার ষোলকলা
ঐকান্তিক এ ভুবন জুড়ে খেলছো হৃদয়, চক্রাকারে সারাবেলা।
(খ) 
তোমার চোখ অতীত বিস্ময়
অনতিদূরের মাস্তুল,
বিষণ্ণ ভ্রমণ শেষে ঘরময় ডাক
জ্ঞাতসারে আরেকটি ভুল।


আজগুবি প্রেম

দেবাশিস চক্রবর্তী সায়ন
------------------------------
বল না রে মেয়ে অমন করে দেখলি কেন আমার দিকে ডাগর চোখে?
জানিসই তো আমায় নিয়ে মন্দ কত বলে লোকে।
বলুক ওরা,মুখ আছে তো, বকেই যাবে,
ক জন নাহয় মুখ ফিরাবে,
তাই বলে কি রাখব না চোখ,
বাঁকা কথা বলুক না লোক,
আমার হৃদয় জামিন রাখি তোর দুহাতে গ্রেফতারিতে...
সওয়ালটা বেশ জোরেই করিস যাবজ্জীবন সাজা দিতে।
হিসাব কষে হৃদয় দেওয়া সেটাই এখন চলতি ফ্যাসন
বুদ্ধিমানে প্রেমের সাথে বুদ্ধি করেই লাভটা পেশন।
কিন্তু আমার আজগুবি প্রেম, রিমেক তো নয় ডাবিং করা,
পুরোনো ছাঁচ জলাঞ্জলি, মনের থেকে মুর্তি গড়া।
এই তো নিলাম হিসাবখাতা,আঁক কেটেছি সারা পাতা, সেসবও ভুল।
মন জুড়ে তোর পিঠ ছাওয়া চুলরাতের মত গহীন কালো,
ওইখানে তো অনেক আগে,লাগামছাড়া অনুরাগে আমার হৃদয় পথ হারালোও
 মেয়ে তোর বাঁকা। 
 ভুরু, ঠোঁটে হাল্কা হাসির রেখা,দিনদুপুরে খুন করে যায়, শরীর জুড়ে পদ্য লেখা।
পারলে পরে যা পালিয়ে, আমার থেকে অনেক দূরে
বিরহে তোর আগুন আঁচে যাকনা আমার বুকটা পুড়ে।
সেই আগুনের বহ্ণিশিখা, আমার, শুধু আমার থাকুক,
হিসাববিহীন ভালবাসায় আজগুবিকে বাঁচিয়ে রাখুক।
চলতি হাওয়ার পন্থী হয়ে বাকি সবাই যাক ওদিকে 
আমার হাঁটা উল্টো পথে, বলেই রাখি জনান্তিকে।
হিসাব টিসাব নেই সে পথে, পদে পদে ঠোকর খাবি,
আজগুবি প্রেম সামাল দিতে , বল না রে মেয়ে, সঙ্গে যাবি?


অবোধ

দেবজ্যোতি পুরকায়স্থ
---------------------------
ভালবাসা কি সত্যি এরূপ হয়
যে মনে শোনে মনে কয়!
কি করে যে বোঝাই বুঝি তার
ভালবাসা বুঝি এমন করে;
জানি না ভালবাসা শব্দের মনভাব
তবু ভালবাসি এমন স্বভাব



সর্ণিমা ও আমার ছেঁড়া স্বপ্নের ছাই

রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ
-------------------------
ভালো হতে চাই না
মার চোখে আমি কীটনাশক
আর বাবার চোখে
শতাব্দীর অভিশাপ ।
মগজ আজ উদ্মাদ
বুকের নিলয়ে পরিয়ায়ী অগ্নিকুণ্ড ।
অকালপক্ক ভালোবাসার ফুল
শরীর চেটে নিচ্ছে
বর্ষার অহংকার ।
জানো সর্ণিমা
তখন এম এ
ডান হাতে অফিসের ঝাড়ু
বাম হাতে রবীন্দ্র রচনাবলী
মনে প্রেমের বীজ
আর সারা দিনের উপোসি ঠোঁটে
বিট লবণের লিকার চা
আস্বাদ নেই
আমি তো জানি কপালে
ভগবানের রম্য হাসি
কোনো অভিযোগ নয়
আজ গাছের ডালে ডালে লেগে রয়েছে
আমার ছেঁড়া স্বপ্নের ছাই
সর্ণিমা তোমার শীত ঘুমে
আমার সহস্র কাঁপুনি চুমু
শরীর আর চেতনায়
ক্ষত আদিম বিষ দাঁতের
তখন আমি কবিতা,শব্দের ভরাট যুবক
একনায়কতন্ত্র সংসারে থু থু ছিটিয়েছি
অপবিত্র প্রতিটি সুখে ।
সর্ণিমা বিশ্ববিদ্যালয় করিডোরে
তখন তুমি এক টুকরো রোদ
সম্পর্কের অভিমানে আমি
বালিশের সহবাস
কেহ জানে না , কেহ জানবে না
আজো আমি পবিত্র অক্ষরে বুনি
সংবাদপত্রের ঘুশখুর মালিকের চোখ
আমি লেখক, আমি সম্পাদক, আমি ক্রোধ
ডিনারের শেষে রাত্রির
অসময়ের যন্ত্রণা
ওঁ শান্তি ! ওঁ শান্তি !
আজ রক্তে জাদুকরী মন্ত্র
নষ্ট গলির গল্প
আর গালে কিশোরীর নরম স্তন
সরনিমা তোমার শ্বাসাঘাত চুলে
জেগেছিল রাতের হাওয়া
নিশ্বাসে ছিল মুক্ত ছন্দ
ঝাঁপসা  জ্যোৎস্নায় শ্মশানের চিতায়
ফাটছে আমার অস্থি
গলে পড়ছে দৃষ্টি
বিশ্বাস করো আমি বেঁচে আছি
হাঁ বেঁচে আছি
ছদ্মরঙ নিয়ে চাঁদ গলায়
ঝাপসা জলদাগ হয়ে বেঁচে আছি ।


সম্পাদক
বিশ্বরাজ ভট্টাচার্য
লেখা পাঠান- im.biswaraj@gmail.com
ছবি: ইন্টারনেট 

Monday, February 12, 2018

ক্যানভাস ৪

গল্প 

 সুবলের মা

শর্মিলী দেব কানুনগো 

  সকাল হতেই গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে সরলা। সুবলের বৌ। শাশুড়ির গুষ্ঠি উদ্ধার করছে। বুড়ি শাশুড়ি দাওয়ার ঘরে শুয়ে আছে। বড় অভিমান হচ্ছে বুড়ির, পেটের ছেলের উপর। এত কষ্ট করে ছেলেকে বড় করেছে। সে ছেলে কি না বৌ এর কথায় উঠে বসে। কেন রে তুই যখন কাঁথা ভেজাতি তখন কি তোর মা পাড়া মাথায় করত? আজকাল সুবলের মা রাতে ঠাহর পায় না। কাঁথা ভিজায়। শরীর বড় দুর্বল। তাই পুকুর ঘাটে কাঁথা নিয়ে ধোয়ার ক্ষমতা নেই। ছেলেটা ফিরেও তাকায় না। অগত্যা বৌ ভরসা। আর বৌ কখনও শাশুড়িকে সুনজরে দেখেনি। তাই বড্ড বিরক্ত হয়ে বুড়ির মৃত্যু কামনা করে। বুড়ি কাঁদে। বুকটা পোড়ে। 
বৌটাকে ছেলে যখন নিজে বিয়ে করে এনেছিল তখন বুড়ি আদর করে ঘরে তুলেছিল। মেয়ের মত আদর করে নিজের পাত থেকে ভালো কিছু হলে বৌয়ের পাতে তুলে দিত। বৌয়ের বাপ ভাইরা কখনও ওকে আর ঘরে তুলেনি। বৌটা মার জন্য কাঁদত। বুড়ি বৌকে বুকে ধরত। চোখ মুছে দিত। 
     এখন সুবলের মা আর ঠিকে কাজ করতে পারে না। ছেলের উপর খায়। তাই সংসারের বোঝা। সারাদিন ছেলেটা বৌটা কথা শুনায়। বুড়ি নিজের মৃত্যু কামনা করে। 
  আবার কি মনে করে বৌকে বলে, 
—ও বৌ দোহাই তোর এতজোরে চেঁচাস না। আমার সুবলের কাঁচা ঘুম ভেঙে যাবে যে। 
বৌ এসব কানেও তোলে না। সমানে গালাগাল দেয় বুড়িকে। 
 সুবল উঠে আসে। বৌ এর কষ্টে সুবল দুঃখ পায়। মা কে দোষারোপ করে। বুড়ি নাকি বৌকে কষ্ট দেওয়ার জন্য ইচ্ছা করেই বিছানা ভিজিয়ে দেয়। পেটের ছেলের কথায় বড় কষ্ট পায় সুবলের মা। নীরবে কাঁদে। এই ছেলেকে কোলের রেখে বাপ মরেছিল। বুড়ি পরের বাড়ি গতর খাটিয়ে একে দু বেলা দুমুঠো খাইয়েছে, বাঁচিয়ে রেখেছে। দুই অক্ষর পড়িয়েছে। বাবুদের বাড়ি থেকে অগ্রিম টাকা চেয়ে এনে দোকান দিয়ে বসিয়েছে। সেই দোকানের আয় নেহাত মন্দ নয়। আজ মার বুঝি ছেলের কাছে কিছুই প্রাপ্য নেই! সুবলের মা গভীর শ্বাস ফেলে কপালে হাত ছোঁয়ায়। কাকে যেন বলে, 
—ভালো রাখ ঠাকুর, আমার সুবলকে ভালো রাখ। 
  সুবলের বৌ কাঁদছে। ওর বাপের বাড়ির গাঁএর একজন এসেছিল আজ। বৌএর মার অবস্থা ভাল না। ছেলে আর বৌ বড় কষ্ট দেয়।ওষুধ পথ্য ছাড়া দিন কাটছে বৌএর মার। 
সুবলের মার বুকটা পোড়ে। কোনও রকমে উঠে আসে বিছানা ছেড়ে। সুবলের বৌ শাশুড়ির বুকে মাথা রেখে কাঁদে, আগের মত। আজ বুঝি বৌ এর বুকটা পোড়ে। বুড়ি চোখ মুছে দেয়। সুবলের মা যে মা।


কবিতা



সময়সরণি
---------------
রাজেশ শর্মা


প্রত্যাশার দুরত্ব থাকে 

বুঝেছি সকল

কবোষ্ণ

ছুঁতে গিয়ে সমস্ত 
স্পর্শে 

নিয়নকুসুম!


খানিকটা বেশি
--------------------
 দ্বৈপায়ণ নায়ার


বড় হচ্ছে সে, তার পৃথিবী
যা বরাবরই আমার চোখের শেষ নীল
মেঘেরা শুধু দিচ্ছে ছোয়া 
সাদা ধনেশটাই যেন হাতে গোনা স্বপ্ন ।

শুধু প্রেমিকা এর জন্যেই 
কি তাহলে পৃথিবীটা ফোঁটা, অচেনা
গুণীরা রাজি হবে, বিজ্ঞানীরাও হবে ।

তুমি তো ভাবনার চেয়ে সবসময়
খানিকটা বেশি
তাই তো বলে, 'চোখে হারিয়ে যাওয়া' ।

কিন্তু হারালে 
নিজেকে পাওয়া যায় ঠিক;

ফেরা যায় ?

গতিক
----------

দেবজ্যোতি পুরকায়স্থ 

বড় আনন্দে আছি
      প্রশ্নচিহ্নে প্রতিপদ ছেড়ে 
স্বপ্নকে সংগী করে 
     আশা নিত্য সহচরী 
বড় আনন্দে আছে

*লিমেরিক*


 ।।  এম রিয়াজুল আজহার লস্কর ।।

ভাংলো হাতি কাঠের সেতু যেই না দিলো গুঁতা,
দুষ্টু হাতি বাঁধতে হবে আনছি দাঁড়া সুতা,
মানুষ এসে ডাঙ্গায়
চোখটা বড় রাঙ্গায়
দুষ্টু হাতি তোমার গলায় বাঁধতে হবে জুতা ! 



*লিমেরিক*
  
 ।।  এম রিয়াজুল আজহার লস্কর ।।

কথা বলেন মানুষেরি, কবি তিনি বাম্পার ! 
বাপের পকেট চুরি করে কিনেছিলেন ডাম্পার,
ব্যবসাতে হোন ব্যর্থ
দুঃখ পেলেন ঢের, তো ;-
রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন ! যাবেন হয়ে ট্রাম্প আর!!

স ম্পা দ ক
------------
বিশ্বরাজ ভট্টাচার্য
৯৪৩৫৬১৫২৫৯
im.biswaraj@gmail

অলংকরণ - ইন্টারনেট

এক ঝলকে

                               প্রচ্ছদ-''রিফিউজিস"          .................................................................